২২ এপ্রিল, ২০১৮ । ৯ বৈশাখ, ১৪২৫

ইলিশ উৎপাদনে বিপ্লবের পথে বাংলাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক | এপ্রিল ২, ২০১৮ - ৬:৫৫ অপরাহ্ণ

বাংলাদেশে অভ্যন্তরীণ মাছ চাষে নীরব বিপ্লব সাধিত হয়েছে। গত তিন দশকে দেশে মাছের উৎপাদন বেড়েছে ২৫ গুণ। উৎপাদিত মাছের ৭৫ শতাংশই এখন বাণিজ্যিকভাবে বাজারজাত করছেন মাছ চাষিরা। ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্স ইনস্টিটিউটের (আইএফপিআরআই) সর্বশেষ সমীক্ষায় এ তথ্য জানানো হয়েছে।

ওই সমীক্ষায় বলা হয়েছে, বাড়তি চাহিদা, প্রযুক্তির উন্নয়ন, যোগাযোগ অবকাঠামো, লাখ লাখ পুকুর মলিক এবং ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগে বাংলাদেশে মাছের উৎপাদন দ্রুতগতিতে বেড়েছে। নিজেদের পারিবারিক প্রয়োজনে মাছ চাষের প্রচলিত ধারণা এখন বদলে গেছে। ভোক্তাদের এখন নিজের পুকুরের মাছ খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাজার থেকে মাছ কেনার প্রবণতাও বেড়েছে বলে উল্লেখ রয়েছে ওই সমীক্ষায়।

সমীক্ষায় বলা হয়, আগে গ্রামের মাছ চাষিরা স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছে মাছ বিক্রি করতেন। এখন তারা উৎপাদিত মাছের দুই-তৃতীয়াংশই ছোট-বড় শহরের আড়তদারদের কাছে বিক্রি করছেন।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান সরকারের যথাযথ উদ্যোগে ২০১৬-১৭ অর্থবছর ৬৮ হাজার ৩০৫ মেট্রিক টন মৎস্য ও মৎস্যজাত পণ্য রফতানির মাধ্যমে আয় হয়েছে ৪ হাজার ২৮৭ কোটি টাকা। এর আগে, ২০০৮-০৯ অর্থবছর দেশে মাছ উৎপাদন হয়েছিল ২৭ লাখ ৪১ হাজার মেট্রিক টন। সরকারের উন্নয়নমুখী বহুবিধ উদ্যোগ ও সেবার পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৫-১৬ অর্থবছর মাছ উৎপাদন ৩৮ লাখ ৭৮ হাজার মেট্রিক টনে উন্নীত হয়েছে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে তা বেড়ে হয়েছে ৪০ লাখ ৫০ হাজার টন। আগামী ২০১৮-১৯ অর্থবছরের মধ্যেই বাংলাদেশ মাছ উৎপাদনে স্বয়ংসর্ম্পূণতা অর্জন করতে পারবে বলে প্রত্যাশা সরকারের।

জানা গেছে, ২০২২ সাল নাগাদ বিশ্বে যে চারটি দেশ মাছ চাষে ব্যাপক সাফল্য অর্জন করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, তার শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশের নাম। বাংলাদেশের পরিবেশ মিঠা পানির মাছ চাষের জন্য পৃথিবীর সবচেয়ে উপযুক্ত স্থান। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) প্রতিবেদনে মিঠা পানির মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ রয়েছে চতুর্থ স্থানে। এর আগে আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ফুড অ্যান্ড এগ্রিকালচার অর্গানাইজেশনও এক সমীক্ষায় জানিয়েছে, বিশ্বে মাছ উৎপাদনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ। সরকার ২০১৯ সালের মধ্যে দেশকে মাছ চাষে স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে বর্তমান ৩৮ লাখ টন থেকে বাড়িয়ে ৪২ লাখ টন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। এ লক্ষ্যে মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট ও মৎস্য অধিদফতর যৌথভাবে কাজ করছে।

বিবিএস সূত্রে জানা গেছে, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে দেশে লবণাক্ত পানিতে মাছের উৎপাদন ছিল ছয় লাখ ৯৭ হাজার টন, মিঠা পানির মাছের উৎপাদন ছিল ৩৩ লাখ ২০ হাজার টন। দেশে ইলিশের উৎপাদন বাড়ার প্রভাবও পড়ছে মাছের সামগ্রিক উৎপাদনে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে দেশে চার লাখ টন ইলিশ উৎপাদিত হয়। আর ২০১৬-১৭ অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল পাঁচ লাখ টন।

মৎস্য অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশের দেশজ উৎপাদনের ৩ দশমিক ৬৯ শতাংশ, মোট কৃষি আয়ের ২২ দশমিক ৬ শতাংশ এবং রফতানি আয়ের ৪ শতাংশেরও বেশি আসে মৎস্য খাত থেকে। এছাড়াও দৈনন্দিন খাদ্যে প্রাণিজ আমিষের প্রায় ৬০ শতাংশ জোগান দেয় এই মৎস্য খাত।
অন্যদিকে, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ সরকারের ভিশন ২০২১-এ দেশের মাছের উৎপাদন ৪৫ লাখ মেট্রিক টন নির্ধারণ করা হয়েছে, যা বর্তমান উৎপাদনের চেয়ে ১০ লাখ মেট্রিক টন বেশি।

বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রায় এক কোটি ৭০ লাখ বা ১১ শতাংশ মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মৎস্য খাতের সঙ্গে সম্পৃক্ত। বছরে প্রায় ৬ লাখ নতুন কর্মসংস্থান হচ্ছে এই খাতে।

এদিকে, বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) ইলিশের অবদান ১ দশমিক ১৫ শতাংশ। দেশে মোট মাছের ১২ শতাংশই ইলিশ। এর অর্থমূল্য আনুমানিক সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকা। আর ইলিশ রফতানির মাধ্যমে আসে দেড়শ থেকে তিনশ’ কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা। ওয়ার্ল্ড ফিশের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বিশ্বের মোট ইলিশের ৬০ শতাংশ উৎপাদিত হয় বাংলাদেশে। এছাড়া ভারতে ২০ শতাংশ, মিয়ানমারে ১৫ শতাংশ এবং আরব সাগর, প্রশান্ত মহাসাগর ও আটলান্টিক মহাসাগরের তীরবর্তী দেশগুলোতে বাকি ৫ শতাংশ ইলিশ ধরা পড়ে।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সূত্রমতে, প্রতিবছরই বাড়ছে ইলিশের উৎপাদন। মাত্র দেড় দশকের ব্যবধানে এ সংখ্যা ছাড়িয়ে গেছে ২ লাখ টনের ঘর। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ১৯৮৬-৮৭ সালে দেশে ইলিশ উৎপাদন হতো ১ লাখ ৯৫ হাজার টন। ২০০২-০৩ অর্থবছরে ১ লাখ ৯১ হাজার টন ইলিশ উৎপাদিত হয়। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৯৫ হাজার টন।

বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষণা থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১০ বছর আগে দেশের ২১টি উপজেলার নদ-নদীতে ইলিশ পাওয়া যেত। বর্তমানে ১২৫টি উপজেলার নদ-নদীতে এই মাছ পাওয়া যাচ্ছে। পদ্মার শাখা নদী মহানন্দা থেকে শুরু করে মৌলভীবাজারের হাকালুকি হাওর এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মেদির হাওরেও এ বছর ইলিশ পাওয়া গেছে।

বাংলাদেশ রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুসারে, চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) হিমায়িত ও জীবিত মাছ রফতানি থেকে আয় হয়েছে ১৬ কোটি ৮১ লাখ ৮৪ হাজার ইউএস ডলার, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৪২ দশমিক ৬৯ শতাংশ বেশি। আর আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় তা ২৩ দশমিক ৫৭ শতাংশ বেশি। চলতি অর্থবছরে এই খাতের রফতানি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৫৩ কোটি ৫০ লাখ ডলার।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দ বলেন, ‘মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ রেকর্ড সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশ এখন মাছে স্বয়ংসম্পূর্ণ। বাংলাদেশ বিশ্বে মাছ উৎপাদনে চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে। গবেষণার মাধ্যমে হারিয়ে যাওয়া অনেক প্রজাতির মাছ এখন চাষ করা হচ্ছে। সরকারি বেসরকারিভাবেও হারিয়ে যাওয়া মাছ চাষ হচ্ছে। মাছ চাষে আরও গবেষণা হবে।’

মন্ত্রী আরও বলেন, ‘এছাড়াও মা ইলিশ ও জাটকা রক্ষায় সরকার ব্যাপক কর্মসূচি নিয়েছে। ইলিশ ধরা বন্ধকালীন জেলেদের বিভিন্ন ধরনের সহায়তাও দেওয়া হচ্ছে।’

শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য দিন

সর্বশেষ
পঞ্জিকা
এপ্রিল ২০১৮
রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহঃ শুক্র শনি
« মার্চ    
১০১১১২১৩১৪
১৫১৬১৭১৮১৯২০২১
২২২৩২৪২৫২৬২৭২৮
২৯৩০  
ছবি গ্যালারি