১৮ জানুয়ারী, ২০১৮ । ৫ মাঘ, ১৪২৪

খোকসার কৃতি সন্তান দ্বিজেন্দ্রনাথ স্যরের জীবনাদর্শ

নিজস্ব প্রতিবেদক | জানুয়ারি ৯, ২০১৮ - ৯:০২ অপরাহ্ণ

খোকসাকে ঢাকা বানানোর স্বপ্নদ্রষ্ঠাদের মধ্যে অনেকেই আজ নেই। তবে এই মিছিলের যিনি কর্ণধার তিনি আমাদের মাঝে এখনও আছেন। জীবন্ত কিংবদন্তী খোকসা কলেজের সাবেক শিক্ষক দ্বিজেন্দ্রনাথ বিশ্বাস আজ শয্যায়। প্রতিদিনই এই মানুষটির খোঁজ-খবর নিচ্ছেন তাঁরই কৃতি ছাত্ররা। এই কৃতি পুরুষের গল্প শোনাচ্ছেন তাঁর কৃতি ছাত্র সাংবাদিক শ্রী দ্বিজেন্দ্রনাথ বিশ্বাস। কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলাকে শিক্ষার আলোয় আলোকিত করতে যাঁরা নিরলস কাজ করেছেন; তাঁদের অগ্রজ। তিনি একসময় খোকসাকে ঢাকা করার স্বপ্নে বিমোহিত ছিলেন। স্বাধীনতার পর তিনিই প্রথম অন্যদের সাথে নিয়ে খোকসা উপজেলায় কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। চরম স্বপ্নবাজ, শিক্ষানুরাগী, পরোপকারী, সাদা মনের মহৎ এই মানুষটি আজ অসুস্থ হয়ে বাস করছেন নিভৃতে।

জন্ম ১৭ নভেম্বর ১৯৪৩ সালে কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলার নিভৃত পল্লী ইসলামপুরে। বাবা দূর্জধন বিশ্বাস পেশায় ডাক্তার ছিলেন। মা ঊষা রাণী বিশ্বাস ছিলেন খোকসার ঐতিহ্যবাহী শ্রীরাজপুর শ্রীশ্রী রাধারমন আশ্রমের ছাত্রী। উপজেলার ঈশ্বরদী ও পাইকপাড়া মির্জাপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তিনি প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন। খোকসা-জানিপুর পাইলচ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৬০ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেন। সেবছর ঢাকা কলেজে ইন্টারমিডিয়েটে ভর্তি হলেও বেশিদিন সেখানে পড়া হয়নি। এরপর ১৯৬২ সালে কুষ্টিয়া সরকারী কলেজ থেকে ইন্টামিডিয়েট এবং ১৯৬৪ সালে ডিগ্রি পাশ করেন। ১৯৬৭ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে এম.এ ইংরেজিতে ভর্তি হয়ে প্রথম পার্ট সম্পন্ন করলেও ফাইনাল পরীক্ষা দেয়া হয়নি।

এখানে উল্লেখ্য যে, এম.এ ফাইনাল পরীক্ষার সময় তাঁর এক গরীব সহপাঠি টাকার অভাবে ফরম পূরণ করতে পারছেন না জেনে নিজের ফরম পূরণের টাকা ঔ সহপাঠিকে দিয়ে তার পরীক্ষার দেবার ব্যবস্থা করে এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। পরে পরীক্ষা না দিয়ে তিনি বাড়ি ফিরে আসেন। পরবর্তীতে স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয়ে গেলে চরম অনিচ্ছা সত্ত্বেও পরিবারের সাথে দেশ ত্যাগ করে ভারতে আশ্রয় নেন। দেশ স্বাধীন হলে সপরিবারে ফিরে আসেন প্রিয় মাতৃভূমিতে। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে শিক্ষায় পশ্চাদপদ এ অঞ্চলের জনগোষ্ঠিকে শিক্ষিত করে গড়ে তোলার লক্ষে অন্যদের সাথে নিয়ে খোকসায় কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তাঁর একটাই স্বপ্ন, তিনি খোকসাকে ঢাকা করবেন। খোকসার মানুষকে শিক্ষিত করবেন।

সকল প্রতিকূলতা দূরে সরিয়ে কঠোর শ্রম, মেধা, গভীর মমত্ববোধ ও আন্তরিকতায় খোকসা ডিগ্রী কলেজ প্রতিষ্ঠায় তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। পৈতৃক জমি বিক্রি করে কলেজ নির্মাণে ও পরবর্তী বিভিন্ন সময় কলেজের প্রয়োজনে অর্থ যুগিয়েছেন। কলেজের আর্থিক দৈন্যতা কাটাতে উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে ঘুরে ঘুরে গুড়, পাট সংগ্রহ করেছেন। গ্রামের বিভিন্ন জনের কাছ থেকে বাঁশ সংগ্রহ করে সেগুলো অন্যদের সাথে তিনিও কাঁধে করে কলেজ প্রাঙ্গনে নিয়ে আসতেন। কলেজের ঘর নির্মাণে তিনি মিস্ত্রিদের সাথে কাজ করেছেন।

কলেজ প্রতিষ্ঠার পর বিভিন্ন জনের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে শিক্ষকদের বেতনের ব্যবস্থা করতেন। কলেজের লাইব্রেরীর বই সংগ্রহ করার জন্য কলেজের উপাধ্যক্ষ রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাসকে সাথে নিয়ে ছুটে গেছেন পাবনা জেলার ঈশ্বরদীর ব্যবসায়ী শঙ্কর মেহতার কাছে। সেসময়ের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বাবু দ্বিজেন্দ্রনাথ বিশ্বাস বলেন, “বিভিন্ন সময় কলেজের শিক্ষকদের বেতনের টাকার জন্যে গোলাম কিবরিয়ার (তৎকালীন এম.পি) কাছে যেতাম। সাথে ব্যাগ ভরে নিতাম ক্ষেতের মটর শাক। তিনি মটরের শাক খুব পছন্দ করতেন। সেই শাক রান্না হলে গোলাম কিবরিয়া সাহেব আমাকে সাথে নিয়ে ভাত খেতেন। এরপর তিনি কলেজের জন্য টাকা দিতেন। এভাবে বেশ কয়েকবার তাঁর দেয়া টাকায় শিক্ষকদের বেতনের ব্যবস্থা হয়েছে।

ইংরেজি ভাষা, সাহিত্য ও ব্যাকরণে রয়েছে তাঁর অগাধ দখল। অনেকে মনে করেন, দ্বিজ্দ্রেনাথ বিশ্বাস নিজেই একজন ইংরেজি শিক্ষার প্রতিষ্ঠান। কলেজে ক্লাশের বাইরেও তিনি উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে ঘুরে ঘুরে ছাত্র-ছাত্রীদের অনেকটা জোর করেই ইংরেজি শিখিয়েছেন। পরিবার ও নিজের সন্তানদের চেয়ে ছাত্র-ছাত্রীদেরকেই তিনি বেশি আপন করে নিয়েছেন। ছাত্র-ছাত্রীদের পিছনেই তিনি তাঁর আয়ের সর্বস্ব ব্যয় করেছেন। নিজের পৈত্রিক জমি বিক্রি করে দরিদ্র ছাত্র-ছাত্রীদের পড়ালেখার খরচ মেটানোর নজিরও রয়েছে তাঁর। আর এভাবেই তিনি ছাত্র-ছাত্রীর হৃদয়ে গন্ডি ছাড়িয়ে অভিবাবকদের মনে একজন সফল ও মহান শিক্ষক হিসেবে নিজেকে অধিষ্ঠিত করেছেন। কলেজের দক্ষ ইংরেজি শিক্ষক ছাড়াও স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে দেশ সেরা রোভার এবং স্কাউট কমান্ডারের স্বীকৃতি পেয়েছেন রাষ্ট্রীয়ভাবে। সমাজের অসহায় অবহেলিত ও দরিদ্র মানুষের পাশে তিনি দাঁড়িয়েছেন অভিবাবকের মতো। বিত্তবান পরিবারের সন্তান হয়েও তিনি স্বাভাবিক জীবন-যাপন করেছেন, চলেছেন সাধারণ মানুষের কাতারে।

স্বরচিত সনেট কবিতা আবৃত্তি করছেন দ্বিজেন্দ্রনাথ বিশ্বাস

তিনি ব্যক্তি উদ্যোগে দুস্থ শীতার্তদের শীতবস্ত্র প্রদান, গরীব ও অসহায় পরিবারের বিবাহযোগ্য মেয়েদের বিয়ের ব্যবস্থা, বন্যা কবলিতদের সহযোগিতা এবং ঈদের সময় ভূমিহীন ও নিস্ব পরিবারে ঈদসামগ্রী বিতরণ করেছেন নিয়মিতভাবে। এছাড়া উপজেলার প্রতিবন্ধিদের সমন্বিত করে তাদের জীবনমান উন্নয়নে সবসময় কাজ করেছেন। মানষের সেবা করাই যেন তাঁর জীবনের একমাত্র ব্রত। উপজেলার ঈশ্বরদী মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায়ও তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। এ বিদ্যালয়ের ঘর তৈরির সময় তিনি মাথায় করে মাটি বয়ে এনেছেন। এছাড়া তাঁর উদ্যোগ ও সহযোগিতায় উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে ধর্মীয় ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে।

শ্রী দ্বিজেন্দ্রনাথ বিশ্বাস একজন সুলেখক। তাঁর লেখা ইংরেজি ও বাংলা সনেট রয়েছে কয়েক হাজার। তিনি অজস্র কবিতা, প্রবন্ধও লিখেছেন। এখন অসুস্থ্য অবস্থায়ও তিনি লিখছেন। তবে তাঁর লেখার এখনও কোন প্রকাশনা হয়নি। ছাত্র-ছাত্রীরা তাঁর লেখা প্রকাশের উদ্যোগ নেবেন বলে বড় ছেলে দেবাশীষ বিশ্বাস আশা করেন।ধর্মবিরু

শ্রী দ্বিজেন্দ্রনাথ অত্যন্ত ধর্মভীরু,একজন ধর্ম প্রচারকও বটে। তিনি শ্রীশ্রী ঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের শিষ্য ও ঋত্বিক। শারিরীকভাবে যখন সুস্থ ছিলেন তখন ঠাকুরের সকল অনুষ্ঠানে দ্বিজেনন্দ্রনাথ বিশ্বাস ছাত্র-ছাত্রীসহ অন্যদের সাথে নিয়ে যোগ দিতেন এবং তাঁর উপর অর্পিত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতেন। তিনি এবং তাঁর সতীর্থরা মিলে বিভিন্ন অনুষ্ঠান উপলক্ষে শ্রীশ্রী ঠাকুর অনুকূলচন্দ্রেকে খোকসাতে এনেছেন কয়েকবার। বাবু দ্বিজেন্দ্রনাথ বিশ্বাস প্রায় এক যুগ কাটিয়েছেন উপজেলার কমলাপুর সিদ্দিকীয়া দরবার শরীফে। তিনি দরবারের পীরসাহেবের একজন একনিষ্ঠ ভক্ত। দ্বিজেন্দ্রনাথ বিশ্বাস তাঁর সতীর্থদের সহযোগিতায় উপজেলার ইসলামপুর গ্রামে শ্রীশ্রী ঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের নামে গড়ে তুলেছেন সৎসঙ্গ আশ্রম। তিনি ঐতিহ্যবাহী খোকসার কালীপূজা মেলার ভলিনটিয়ার্স প্রধানের দায়িত্ব পালন করেছেন অনেক বছর।

খোকসাকে ঢাকা করা বা খোকসা কেন্দ্রিক তাঁর ইচ্ছা বাস্তবায়নের ব্যাপারে দ্বিজেন্দ্রনাথ বিশ্বাসের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি জানান, তাঁর প্রচেষ্টা আজ অনেকটাই সফল হয়েছে। তিনি বলেন, খোকসা ঢাকা হয়নি কিন্তু খোকসার মানুষ আজ ঢাকা যেতে শিখেছে। এখানেই তাঁর স্বার্থকতা। তাঁর প্রশান্তি এখানেই যে; তাঁর সংস্পর্শে বেড়ে ওঠা ছাত্র-ছাত্রীরা আজ দেশ ও বিদেশে গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন থেকে দেশ ও মানুষের সেবায় কাজ করছেন।
আইডিয়াল কলেজের ইংরেজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক মদন মোহন বিশ্বাস এর মতে, “দ্বিজেন্দ্রনাথ বিশ্বাস একটি নাম, একটি বিশ্বাস, একটি নক্ষত্র। তিনি সুলেখক, অভিনেতা, ধর্মপ্রচারক ও শিক্ষকের শিক্ষক, গুরুর গুরু। আমার জানা মতে, তিনিই একমাত্র ব্যক্তি যিনি প্রতি ঘন্টায় একটি করে সনেট লিখতে পারেন।

দ্বিজেন্দ্রনাথ বিশ্বাস সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে খোকসা কলেজের সাবেক উপাধ্যক্ষ রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস বলেন, “তখন সবে মাত্র নারায়নগঞ্জের একটি কলেজে অধ্যাপনা শুরু করেছি; এমনি একদিন দ্বিজেনদা আমার হাত ধরে বললেন-রবিদা, আপনাকে খোকসা যেতে হবে- খোকসাতে আমরা একটি কলেজ গড়ার চিন্তা করছি-খোকসাকে আমরা ঢাকা করবো। সেদিন দ্বিজেনদার অনুরোধ ও একান্ত প্রাণের টানে খোকসা চলে এসেছিলাম। দ্বিজেনদার খোকসাকে ঢাকা করার স্বপ্ন আমাকে বিমোহিত করেছিল। তিনি বলেন, সেদিনটা আমার আজও দারুন মনে পড়ে; ১৯৭২ সালের ১৫ জুলাই। ২য় ঘন্টায় ক্লাশ নেবার জন্য দ্বিজেনদা আমাকে নির্বাচিত করলেন। একটি কক্ষে নিয়ে তিনি ভাল করে আমার চুল আঁচড়িয়ে দিলেন এবং বললেন এক লেকচারে ছাত্র-ছাত্রীর মন জয় করা চাই। এমন অনেক ঘটনা আজও মনের মধ্যে নাড়া দেয়। দ্বিজেনদা খোকসা কলেজের পেছনে তাঁর জীবনকে উৎসর্গ করেছেন বলে তিনি মন্তব্য করেন।

কৃতি পুরুষ দ্বিজেন্দ্রনাথের সাথে লেখক ফারুক আহমেদ

যিনি খোকসার বুকে জ্বেলেছেন জ্ঞানের প্রদীপ, শিক্ষার আলোয় আলোকিত করেছেন হাজার হাজার ছাত্র-ছাত্রীর হৃদয়। যাঁর সংস্পর্শে এসে মানুষ পেয়েছে আলোর দিশা। সবার হয়ে থাকা ছাত্র-ছাত্রীদের প্রিয় এই মহান শিক্ষক অসুস্থ হয়ে আজ বড় একাকী। জীবন কাটছে নিভৃতে, বাড়ীর আঙিনার মধ্যে। এখন নিজ গ্রাম উপজেলার ঈশ্বরদী বাড়ীতে স্ত্রী শোভা রানী বিশ্বাস, বড় ছেলে দেবাশীষ বিশ্বাস, মেঝ ছেলে দেবপ্রসাদ বিশ্বাস মাইকেল, ছোট ছেলে দেব দুলাল বিশ্বাস, ছেলেদের বউ আর নাতি-নাতনীর সেবা ও সান্নিধ্যে কাটছে তাঁর জীবন। বড় ছেলে দেবাশীষ বিশ্বাস বলেন, ২০০৭ সালে ঠাকুমা (দাদী) মারা যাবার কয়েক মাসের মধ্যেই বাবা অসুস্থ হয়ে পড়েন। এখন তিনি আর স্বাভাবিকভাবে হাঁটাহাঁটি করতে পারেননা। বাড়ীর আঙিনাতে বসে দিনের অধিকাংশ সময় লেখালেখি করেন। মাঝে মাঝে বাবার ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে কেউ কেউ বাড়ীতে এসে বাবাকে দেখে যায়, কেউ ফোনে বাবার খবর নেয়।

শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য দিন

সর্বশেষ
পঞ্জিকা
জানুয়ারি ২০১৮
রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহঃ শুক্র শনি
« ডিসে    
 
১০১১১২১৩
১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
২৮২৯৩০৩১  
ছবি গ্যালারি