১৮ অগাস্ট, ২০১৯ । ৩ ভাদ্র, ১৪২৬

কোথা থেকে মশার ওষুধ নেয় ডিএসসিসি!

নিজস্ব প্রতিবেদক | মে ৮, ২০১৮ - ৬:৫৯ অপরাহ্ণ

 

মশার যন্ত্রণা নিয়ে অভিযোগের শেষ নেই নগরবাসীর। মশক নিয়ন্ত্রণে ধারাবাহিক ব্যর্থতায় তীব্র সমালোচনার মুখে রয়েছে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন-ডিএসসিসি ও ডিএনসিসি। অভিযোগ রয়েছে, মশা মারতে করপোরেশন যে ওষুধ ছিটায় তা ঠিকমতো কাজ করে না। এ ওষুধ সিটি করপোরেশন কোনও কেমিক্যাল বা ওষুধ কোম্পানি থেকে কেনে না। বরং, নারায়ণগঞ্জের একটি জাহাজ নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সংগ্রহ করে।

সরকারি মালিকানাধীন এই প্রতিষ্ঠান দেশের বাইরে থেকে মশক নিধনের ওষুধ সংগ্রহ করে সিটি করপোরেশনগুলোর কাছে সরবরাহ করে। দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) নিজস্ব পরীক্ষায় এ ওষুধ মশক নিধনে ব্যর্থ প্রমাণিত হয়। এ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনাও হয়েছে। তারপরও ওই প্রতিষ্ঠান থেকে এবছরও বিপুল টাকার ওষুধ কিনেছে ডিএসসিসি।

তবে গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) ওই প্রতিষ্ঠান থেকে ওষুধ না কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। গত তিন বছর ধরে ওই প্রতিষ্ঠান থেকে মশক নিধনের ওষুধ সংগ্রহ করছে দুই সিটি করপোরেশন।

সূত্র জানিয়েছে, পেস্টিসাইড রুলস-১৯৮৫ দ্বারা দেশে কীটনাশক আমদানি, উৎপাদন, সংরক্ষণ, ক্রয়-বিক্রয় নিয়ন্ত্রিত হয়। কীটনাশক সম্পর্কিত কাজের সঙ্গে জড়িত যেকোনও প্রতিষ্ঠানকে অবশ্যই কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উদ্ভিদ সংরক্ষণ উইং থেকে লাইসেন্স নিতে হয়। কিন্তু ডিএসসিসির ভাণ্ডার ও ক্রয় বিভাগ থেকে জিটুজি (সরকার থেকে সরকার) পদ্ধতিতে মশার ওষুধ সরবরাহের জন্য নারায়ণগঞ্জের যে জাহাজ নির্মাণ ও মেরামতকারী প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে, ওষুধের মান যাচাই করার মতো সুযোগ ওই প্রতিষ্ঠানের থাকার কথা নয়।

এ তথ্যের প্রমাণও পাওয়া গেছে। গত ৮ এপ্রিল ওই প্রতিষ্ঠান থেকে ওষুধ সংগ্রহ করে নগর ভবনের সামনে নিজস্ব পদ্ধতিতে পরীক্ষা করে ডিএসসিসি। পরে তা আবার ল্যাব পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়। নিজস্ব পদ্ধতি অনুযায়ী, মশা নিধনের জন্য সংগ্রহ করা কীটনাশকের কার্যকারিতা পরীক্ষা করতে নির্দিষ্ট আকারের ছোট ছোট তিনটি খাঁচার মধ্যে ৫০টি করে ১৫০টি মশা রাখা হয়। খাঁচাগুলোর ৪/৫ ফুট দূরে সাদা কাপড়ের বেড়া দিয়ে ঘিরে এর মধ্যে ফগিং করা হয়। এসময় ওষুধের পাশাপাশি মেশিনের ধোঁয়ায় পুরো এলাকাটি ঢেকে যায়। এভাবে অন্তত তিন মিনিট ওষুধ ছিটানো হয়।

এর ২০ মিনিট পর দেখা যায় সব কটি মশা মরেনি। পরে ফগিং করা খাঁচাগুলো ২৪ ঘণ্টা পর আবার দেখার জন্য নির্দিষ্ট স্থানে রেখে দেওয়া হয়। এ সময়ের মধ্যে যদি বন্দি কোনও মশা নড়েচড়ে ওঠে তবে তাদের খাবারও দেওয়া হয়। ২৪ ঘণ্টা পর জীবিত মশার সংখ্যা আবারও গণনা করা হয়। তখন যদি মৃত মশার হার ৮০ শতাংশ হয়, তাহলে ধরে নেওয়া হয় ওষুধের গুণগত মান ঠিক আছে।

কিন্তু সেদিনের পরীক্ষায় দেখা গেছে, মানদণ্ড অনুযায়ী মশা মরেনি। মশা নিধনের হার ৮০ শতাংশের নিচে। এ নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মধ্যে ক্ষোভও দেখা দিয়েছে। তারা বলছেন, এভাবে ছোট্ট একটি খাঁচার মধ্যে বন্দি করে ফগিং করলে শুধু মশা কেন, মানুষ কিংবা যেকোনও প্রাণীর সঙ্গে সঙ্গেই মারা যাওয়ার কথা। তাহলে মশা মরছে না কেন?

কিন্তু এরপরও জাহাজ নির্মাণকারী ওই প্রতিষ্ঠানকে ৭ লাখ লিটার লার্ভিসাইডিং এবং ৪ হাজার লিটার অ্যাডাল্টিসাইডিং ওষুধ সরবরাহের কার্যাদেশ দেয় ডিএসসিসি। যার মূল্য প্রায় ২৩ কোটি ৬০ লাখ টাকা। এ ওষুধের প্রায় অর্ধেকের মতো ইতোমধ্যে সরবরাহও করেছে ওই প্রতিষ্ঠান।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা খান মো. বিলাল বলেন, ‘মশার ওষুধ যেখান থেকেই সংগ্রহ করা হোক না কেন, আমরা তিনটি পরীক্ষা করেই ওষুধ সংগ্রহ করি। সব কটি পরীক্ষার ফল সন্তোষজনক হলে দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সিদ্ধান্তক্রমে ওষুধ কেনা হয়।’

তবে ওষুধের গুণগত মান নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দেওয়ায় উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) এই ওষুধ ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সংস্থাটি বলছে, নিয়ম অনুযায়ী ওষুধ ছিটানোর পরও মশা নিয়ন্ত্রণে না আসায় ওষুধ পরিবর্তন করা হচ্ছে। এ জন্য জাহাজ নির্মাণকারী সরকারি ওই প্রতিষ্ঠানকে এবার ওষুধ ক্রয়ের কার্যাদেশ দেওয়া হয়নি।

এ বিষয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র মো. ওসমান গণি সম্প্রতি বলেন, ‘মশার উৎপাত একটু বেড়েছে। আমরা নিয়মিত চেষ্টা করে যাচ্ছি। ওষুধ ছিটাচ্ছি। এরপরও মশা কমছে না। আমরা এখন ওষুধ পরিবর্তন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’

দুই সিটি করপোরেশন সূত্র জানায়, মশা নিধনে সিটি করপোরেশন প্রতিবছর বাৎসরিক পরিকল্পনা নেয়। কর্মপরিকল্পনার অংশ হিসেবে সংস্থা দুটির ১০টি অঞ্চলের ৯৩টি ওয়ার্ডে মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে থাকে। প্রতি ওয়ার্ডে ৪-৬ জন মশক নিধনকর্মী দুই বেলা ওষুধ ছিটান। সকালে লার্ভিসাইডিং (মশার লার্ভা মারার কীটনাশক) এবং বিকালে অ্যাডাল্টিসাইড (প্রাপ্তবয়স্ক মশা মারার কীটনাশক) কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। কর্মপরিকল্পনা অনুসারে, ৩-৪ দিন পর একইস্থানে কীটনাশক প্রয়োগ করা হয়। মাঠপর্যায়ে এই কার্যক্রম করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের মশক সুপারভাইজার, স্বাস্থ্য পরিদর্শক ও সহকারী স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা তত্ত্বাবধান করেন। কিন্তু এসবের মনিটরিং ও কারিগরি দিক দেখার মতো তাদের কোনও দক্ষ জনবল নেই।

সূত্র আরও জানায়, ওষুধের মান যাচাইয়ের জন্য উভয় সিটি করপোরেশনে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার নেতৃত্বে ১১ সদস্যের উচ্চপর্যায়ের কমিটি রয়েছে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন, সংস্থার প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা, প্রধান ভাণ্ডার ও ক্রয় কর্মকর্তা, প্রধান আইন কর্মকর্তা; রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) কীটতত্ত্ব বিভাগের একজন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উদ্ভিদ সংরক্ষণ উইংয়ের একজন উপ-পরিচালক এবং করপোরেশনের পাঁচজন কাউন্সিলর। তবে এই কমিটির কেউ সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারছেন না বলে অভিযোগ রয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ডিএসসিসির কমিটির একজন সদস্য  বলেন, কখনও কমিটির কোনও সভা হয় বলে আমার মনে হয় না। আমি কখনও কোনও সভার আমন্ত্রণ পাইনি। তাছাড়া আমাদের অনেকেরই ওষুধের মান বোঝার মতো কারিগরি দক্ষতা নেই। ক্রয় বিভাগের কর্মকর্তারাই তাদের নিজস্ব পদ্ধতিতে নতুন ওষুধ সংগ্রহ করে ল্যাবে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে কমিটির সদস্যদের কাছ থেকে স্বাক্ষর নিয়ে নেন। এক্ষেত্রে ওষুধ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এবং ল্যাব পরীক্ষা থেকে যা বুঝানো হয়, তা নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয় সদস্যদের। পরীক্ষায় কী হয়, না হয় সেসব তাদের বোঝারও ক্ষমতা নেই।

শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য দিন

সর্বশেষ
পঞ্জিকা
আগস্ট ২০১৯
রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহঃ শুক্র শনি
« ফেব্রু    
 
১০
১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
১৮১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭২৮২৯৩০৩১
ছবি গ্যালারি