১৫ ডিসেম্বর, ২০১৮ । ১ পৌষ, ১৪২৫

যে কারনে বাড়ছে রডের দাম !

নিজস্ব প্রতিবেদক | মার্চ ২৯, ২০১৮ - ১১:০৮ অপরাহ্ণ

আন্তর্জাতিক বাজারে সিমেন্টের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত ক্লিংকারের দাম বেড়েছে। একইসঙ্গে বেড়েছে রডের কাঁচামাল হিসেবে পরিচিত স্ক্র্যাপ ডলারের দামও। এখন নির্মাণকাজের মৌসুম হওয়ায় সৃষ্টি হয়েছে রড ও সিমেন্টের বাড়তি চাহিদা। সুযোগটি কাজে লাগিয়ে উভয় শিল্পের মিলারদের সিন্ডিকেট যুক্ত হয়েছে এর সঙ্গে। এই পাঁচ কারণে অস্থির হয়ে উঠেছে দেশে রড ও সিমেন্টের বাজার।

বাজারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত একমাসের ব্যবধানে দেশে রডের মূল্য কেজিতে বেড়েছে প্রায় ১৫ টাকা। আর এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে সিমেন্টের দামও। এখন নির্মাণকাজের মৌসুম। ফলে সিমেন্ট ও রডের চাহিদ এ সময় বেশি থাকে। এ সুযোগটা কাজে লাগাতে মূল্য বাড়ানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীরা। তবে মিল মালিকরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে সিমেন্টের কাঁচামাল ক্লিংকার, রডের কাঁচামাল স্ক্র্যাপ ও ডলারের মূল্যের সঙ্গে পরিবহন খরচ, বন্দরের খরচ ও সুদের হার বেড়েছে বলেই উৎপাদিত পণ্যের দাম বেড়েছে। একমাস আগে যে রড ৪৭ টাকা কেজিতে বিক্রি হয়েছে সেই রড বর্তমানে বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ৫৭ টাকায়। কোম্পানি ভেদে প্রতিটন ৬০ গ্রেডের রড বিক্রি হচ্ছে ৬৯-৭২ হাজার টাকায়। দুই মাস আগে যা বিক্রি হয়েছে ৪৮-৫০ হাজার টাকা দরে। আর ৪০ গ্রেডের নিম্নমানের রড টনপ্রতি বিক্রি হচ্ছে ৫৭-৬০ হাজার টাকায়। দুই মাস আগে যা ছিল ৪০-৪২ হাজার টাকা। টনপ্রতি প্রায় ২০ হাজার টাকা বেড়েছে রডের দাম।

গত দুই মাস আগে যে সিমেন্টের ব্যাগ বিক্রি হয়েছে ৩৯০ টাকা থেকে ৪০০ টাকায়, বর্তমানে সেই সিমেন্টর ব্যাগ বিক্রি হচ্ছে পাঁচশ থেকে ৫১০ টাকা দরে। বিক্রেতারা বলছেন, মাস ২ আগেও বসুন্ধরা ব্র্যান্ডের সিমেন্টের ব্যাগের দাম ছিল ৩৫৫-৬০০ টাকা। এখন তা বিক্রি হচ্ছে ৪৭০-৪৮০ টাকা। সুপারক্রিট ও আনোয়ার ব্র্যান্ডের সিমেন্টের দামও বেড়েছে একই হারে। প্রতি ব্যাগ হোলসিম ব্র্যান্ডের সিমেন্ট বিক্রি হতো ৩৯০-৪০০ টাকায়। এখন তা বিক্রি হচ্ছে ৫১০-৫২০ টাকায়।

রড সিমেন্টের এই মূল্য বৃদ্ধিতে ইতোমধ্যেই সংকটে পড়েছে নির্মাণ শিল্প। অতিরিক্ত ব্যয় বৃদ্ধিও কারণে বন্ধ হয়ে যাবে সরকারের চলমান উন্নয়ন কার্যক্রম। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব কনস্ট্রাকশন ইন্ডাস্ট্রি (বিএসিআই) কর্মকর্তারা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের দাম আসলে বাড়েনি। এসব কাঁচামালের দাম এখন স্থিতিশীল। সিন্ডিকেটের মাধ্যমে নির্মাণসামগ্রীর দাম বাড়িয়ে মিল মালিকরা অনৈতিক মুনাফা করছেন। এতে দেশের আবাসনসহ অবকাঠামো উন্নয়ন কাজের গতি কমে যেতে পারে বলে অভিযোগ করেছে আবাসন খাতের ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব)। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে রিহ্যাব নেতারা বলছেন, রড-সিমেন্টের মূল্য বৃদ্ধির কোনও কারণই নেই। মিলারদের দাবি পুরোপুরি অযৌক্তিক।

তারা দাবি করেছেন, মিল মালিকদের দাবি অনুযায়ী রডের কাঁচামাল, সিমেন্টের কাঁচামাল, পরিবহন ও ডলারের দাম বাড়ে, তাহলে প্রশ্ন হলো, তা কত বেড়েছে? তারা বলছেন, টনপ্রতি রডের দাম বাড়তে পারে সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা। আর সিমেন্টের দাম বাড়তে পারে ব্যাগ প্রতি ২০ থেকে ৩০ টাকা। কিন্তু বর্তমানে রডের দাম বেড়েছে টনপ্রতি ২০ হাজার টাকা। আর সিমিন্টের দাম বেড়েছে ব্যাগপ্রতি ১১০ টাকা।

এ প্রসঙ্গে বিএসিআই সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার মুনীর উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘কিছু অসাধু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে রডের মূল্য বাড়াচ্ছেন, যার বড় অংশই মিলমালিক।’ এ দিকে রিহ্যাব নেতারা বলছেন, রড-সিমেন্টের ওপর নতুন করে কোনও ধরনের ভ্যাট ট্যাক্স আরোপ হয়নি। কাঁচামালেরও মূল্য বাড়েনি। তাই হঠাৎ করে এ সব পণ্যের মূল্য বেড়ে যাওয়ার কোনও কারণ নেই। অসাধু ব্যবসায়ীদের কারসাজিই এই অস্থিরতার জন্য দায়ী।’

দেশের প্রধান ৪টি সিমেন্ট কারখানাই এই মূল্য বৃদ্ধির কারণ বলে অভিযোগ তুলেছেন পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীরা। তাদের অভিযোগ, এসব কারখানার মালিকই একজোট হয়ে সিন্ডিকেট করেছেন অনৈতিক মুনাফার আশায়। তারাই রড সিমেন্টের বাজার অস্থির করে তুলেছেন।

ব্যবসায়ীদের এমন অভিযোগ অস্বীকার করে বাংলাদেশ অটো রি-রোলিং অ্যান্ড স্টিল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক নেতা এ কে মাসুদুল আলম মাসুদ বলেন, ‘সিজনাল কারণে এ সময় রড সিমেন্টের দাম কিছুটা বেড়েছে। এখানে কোনও কারসাজি নেই। আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামাল ও ডলারের বিনিময় হার বৃদ্ধি, গ্যাস-বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি ও পরিবহন খরচ বেড়ে যাওায় রডের দাম বেড়েছে।’ তিনি বলেন, ‘সরকারি দরের চেয়ে বাজারে রডের দাম এখনও কম। সরকারি হিসাবে এখন রডের মূল্য ৮৪ টাকা কেজি। কিন্তু আমরা কেউই ৭২ টাকা কেজি দরের বেশিতে রড বিক্রি করছি না। এ ছাড়া ডলারের বিনিময় হার কমলে রডের মূল্যও কমবে।’ উল্লেখ্য, বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য মতে বর্তমানে প্রতি ডলারের বিনিময় হার ৮৩ টাকা।

এদিকে রডের এই দাম কেনও অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে তা রড ব্যবসায়ীদের কাছে তা লিখিতভাবে জনতে চেয়েছেন এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি মো. শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন। তিনি বৃহস্পতিবার চেম্বার ভবনে অনুষ্ঠিত এক সভায় বলেন, কত টাকা রডের উৎপাদন খরচ বেড়েছে। আর বাজারে কত দাম বাড়িয়েছেন, দাম বাড়ানোর যৌক্তিকতা কতটুকু এ সব তথ্যও জানতে চেয়েছেন তিনি। এফবিসিসিআই সভাপতি বলেছেন, এর সঙ্গে ব্যবসায়ীদের ভাবমূর্তি জড়িত।

ওই অনুষ্ঠানে মেট্রোসেম সিমেন্ট কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ শহিদুল্লাহ বলেন, ‘রডের কাঁচামাল যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করতে হয়। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র এ কাঁচামালের ওপর কর বাড়িয়েছে। আগে যেখানে আমদানি খরচ ৩০০ ডলার লাগতো। এখন সেখানে লাগে ৪৩০ ডলার।’

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেছেন, ‘কেউ যেন কৃত্রিম সংকট তৈরি করতে না পারে, সেদিকে নজর রাখা হবে। বিষয়টি নিয়ে আগামী মাসে সব পক্ষের সঙ্গে বসা হবে। তবে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জেনেছি, আগে প্রতি ট্রাকে ২০ টন রড সিমেন্ট পরিবহন করা হতো। রাস্তা ঠিক রাখার জন্য এখন ১০ টন পরিবহন করা হচ্ছে। এতে খরচ দ্বিগুণ বেড়েছে। একইসঙ্গে বেড়েছে ডলারের দাম।

শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য দিন

সর্বশেষ
পঞ্জিকা
ডিসেম্বর ২০১৮
রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহঃ শুক্র শনি
« অক্টো    
 
১০১১১২১৩১৪১৫
১৬১৭১৮১৯২০২১২২
২৩২৪২৫২৬২৭২৮২৯
৩০৩১  
ছবি গ্যালারি