২৩ ফেব্রুয়ারী, ২০১৯ । ১১ ফাল্গুন, ১৪২৫

শক্তিমানের শেষকৃত্যে যাওয়ার পথে গাড়িতে গুলি, নিহত ৫

নিজস্ব প্রতিবেদক | মে ৫, ২০১৮ - ১:২৩ অপরাহ্ণ

পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (এমএন লারমা) নেতা শক্তিমান চাকমার শেষকৃত্যে যোগ দিতে যাওয়ার পথে রাঙ্গামাটিতে একটি মাইক্রোবাসে গুলি চালিয়ে ৫ জনকে হত্যা করা হয়েছে। নিহতরা হলেন ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক দলের সভাপতি তপন জ্যোতি চাকমা ওরফে বর্মা (৫০), জনসংহতি সমিতি এমএন লারমা দলের সহযোগী সংগঠন যুব সমিতির সদস্য টনক চাকমা (২২), সেতু দেওয়ান (৩৬), সুজন চাকমা (২৭) ও গাড়িচালক মো. রাজীব (৩২)। আহত হয়েছে আরো ৮ জন।

শুক্রবার সকাল ১১টার দিকে খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটি জেলার সীমান্তবর্তী এলাকা নানিয়াচর উপজেলার বেতছড়ি এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। রাঙ্গামাটি পুলিশ সুপার আলমগীর কবির ঘটনা ও হতাহতের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। এ ঘটনার জন্য প্রসিতপন্থি ইউপিডিএফকে দায়ী করা হয়েছে।

স্থানীয় ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, সকালে মহালছড়ি থেকে ১০/১২টি গাড়ি বহর নিয়ে শক্তিমানের শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে যোগ দিতে নানিয়াচরে আসছিলেন জেএসএস এমএন লারমা দল ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা। তাদের সঙ্গে একটি সাদা মাইক্রোবাসে করে আসছিলেন ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক দলের সভাপতি তপন জ্যোতি চাকমা। বহরটি সকাল ১১টায় মহালছড়ি সীমানা পেরিয়ে রাঙ্গামাটি জেলার বেতছড়িতে প্রবেশ করলে অস্ত্রধারীরা সাদা মাইক্রোবাসের চালককে লক্ষ্য করে গুলি করলে চালক গাড়ি নিয়ন্ত্রণ হারালে মাইক্রোবাসটি উল্টে যায়। এতে গাড়ির ভেতরে থাকা তপন জ্যোতিসহ তার সঙ্গীরা আহত হন। এ সময় সন্ত্রাসীরা গাড়ির কাছে গিয়ে তপন জ্যোতি চাকমাকে আগে গুলি করে হত্যা করে। এরপর তার সঙ্গে থাকা সঙ্গীদের লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি করলে ঘটনাস্থলে তপন জ্যোতিসহ মারা যায় ৩ জন। আহতদের উদ্ধার করে খাগড়াছড়ি সদর হাসপাতালে নেয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক দুজনকে মৃত ঘোষণা করেন।

জেএসএস এমএন লারমা দলের কেন্দ্রীয়সহ তথ্য প্রচার সম্পাদক প্রশান্ত চাকমা বলেন, শক্তিমান একজন বড় মাপের নেতা ছিলেন। তাকে শেষ বারের মতো দেখতে আমাদের নেতাকর্মীরা নানিয়াচর যাচ্ছিলেন। কিন্তু যাওয়ার পথে ইউপিডিএফের স্বশস্ত্র সন্ত্রাসীরা আমাদের নেতাকর্মীদের ওপর গুলি করে। এ ঘটনার জন্য ইউপিডিএফ প্রত্যক্ষভাবে জড়িত বলে অভিযোগ করেন প্রশান্ত।

ইউপিডিএফের কেন্দ্রীয় তথ্য প্রচার বিভাগের নিরণ চাকমা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, অভিযোগ করা হয়েছে তা সত্য নয়। গাড়ি বহরটি সামনে ও পেছনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গাড়ি ছিল। তারা নিরাপত্তা দিয়ে তাদের নানিয়াচর নিয়ে যাচ্ছিলেন। এত নিরাপত্তার মধ্যে এতবড় হত্যাকাণ্ড ঘটানো তা ছিল অবিশ্বাস্য। এ ঘটনায় আসলে কারা জড়িত তা প্রশাসন জানবে।

রাঙ্গামাটির পুলিশ সুপার আলমগীর কবির বলেন, ঘটনাস্থলেই ৩ জন নিহত হয়েছেন। আর আহতদের খাগড়াছড়ি সদর হাসপাতালে নেয়ার পর সেখানে মারা গেছে ২ জন। রাঙ্গামাটির নানিয়াচর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শক্তিমান চাকমা খুন হওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নতুন করে এই হত্যাকাণ্ডে পাহাড়ে তৈরি হয়েছে উত্তেজনা। বৃহস্পতিবার বাসা থেকে মোটরসাইকেলে করে উপজেলা পরিষদে নিজের কার্যালয়ে যাওয়ার সময় গুলি করে হত্যা করা হয় শক্তিমানকে। সে সময় তার সঙ্গে থাকা জেএসএস (এমএনলারমা) নানিয়াচর উপজেলা কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক রূপম চাকমাও গুলিবিদ্ধ হন।

খাগড়াছড়ি সদর থানার ওসি শাহাদাত হোসেন টিটু জানান, আহতদের মধ্যে ৮ জনকে খাগড়াছড়ি সদর হাসপাতালে নেয়ার পর চারজনকে ভর্তি করে বাকি ৪ জনকে চট্টগ্রাম মেডিকেলে পাঠাতে বলেছেন আরএমও নয়নময় ত্রিপুরা।

ইউপিডিএফের (গণতান্ত্রিক) মিডিয়া উইংয়ের দায়িত্বে থাকা লিটন চাকমা বলেন, শক্তিমান চাকমাকে হত্যা করার পর তপনজ্যোতি চাকমা বর্মাকে হত্যার মধ্য দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে একক সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য তারা (ইউপিডিএফ) একের পর এক খুনের ঘটনা ঘটিয়ে চলেছে। ইউপিডিএফ থেকে বেরিয়ে গিয়ে নতুন দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা ইউপিডিএফের (গণতান্ত্রিক) নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন তপনজ্যোতি চাকমা বর্মা।

প্রসঙ্গত, ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিকে বিরোধিতা করে ১৯৯৮ সালে ২৬ ডিসেম্বর প্রসিত খিসার নেতৃত্বে ইউপিডিএফ নামে নতুন সংগঠন গঠন হয়। এ সংগঠন শুরু থেকে সরকারের সঙ্গে চুক্তি সম্পাদনকারী দল সন্তু লারমার নেতৃত্বে থাকা জনসংহতি সমিতির সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে পড়ে। এতে উভয় পক্ষ থেকে সাড়ে ৬শ’র অধিক নেতাকর্মী মারা যায়।

এরপর জরুরি অবস্থাকালীন ২০১০ সালে সন্তু লারমা দল থেকে সরে গিয়ে সুধাসিন্ধু খিসা, তাতিন্দ্রলাল চাকমা পেলে, শক্তিমান চাকমাদের নেতৃত্বে গঠন হয় জেএসএস এমএন লারমা নামে নতুন দল। এ দলটি প্রসিতের ইউপিডিএফের সঙ্গে সখ্য গড়ে দলীয় কার্যক্রম পরিচালনা করে এবং সন্তু লারমা জেএসএসের সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে ২০১৫ সালের শেষের দিকে উভয় পক্ষের মধ্যে সমঝোতার ভিত্তিতে দলীয় কার্যক্রম চলে। পরবর্তী ২০১৭ সালে নভেম্বর ১৫ তারিখে প্রসিতের ইউপিডিএফ থেকে সরে গিয়ে তপন জ্যোতি চাকমা বর্মা গঠন করেন ইউপিডিএফ গণতন্ত্র নামে নতুন দল। এ দলটি জেএসএস এমএন লারমা দলের সঙ্গে সখ্য গড়ে মূল ইউপিডিএফের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়লে নতুন করে সংঘাত শুরু হয়। ২০১৭ সালে ৫ ডিসেম্বর রাঙ্গামাটির নানিয়াচর উপজেলার ১৮ মাইল এলাকায় অনাদী রঞ্জন চাকমাকে হত্যার মধ্য দিয়ে নতুন করে সংঘাত শুরু হয়। যা বর্তমানে অব্যাহত আছে। এ সংঘাতে গতকাল পর্যন্ত মারা গেছেন ১৬ জন। গত বছর নভেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে ইউপিডিএফ গণতন্ত্র নামে নতুন একটি দলের আত্মপ্রকাশ হলে মূল ইউপিডিএফের সঙ্গে বিরোধ সৃষ্টি হয় জেএসএস এমএন লারমা দলের মধ্যে। এ বিরোধের জেরে নভেম্বর থেকে গতকাল ৫ জনসহ ১৬ জন নিহত হলেন।

শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য দিন

সর্বশেষ
পঞ্জিকা
ফেব্রুয়ারি ২০১৯
রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহঃ শুক্র শনি
« অক্টো    
 
১০১১১২১৩১৪১৫১৬
১৭১৮১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭২৮  
ছবি গ্যালারি