উপনিষদের সর্বেশ্বরবাদী ধর্ম – ড: আর এম দেবনাথ

উপনিষদ : শিক্ষিত হিন্দুদের একাংশের কাছে ‘মহাভারতের চেয়ে গীতার কদর বেশি। একইভাবে ‘বেদের’ চেয়ে তাদের কাছে কদর বেশি ‘উপনিষদের’। সাধারণ হিন্দু অবশ্য বেদ, উপনিষদ ও গীতা এ তিনটি সম্বন্ধেই উদাসীন বা অজ্ঞ। তাদের জন্য সুখপাঠ্য হিসেবে রক্ষিত আছে রামায়ণ ও মহাভারত যা বর্ণাশ্রম (চার বর্ণ ও চার আশ্রম) ভিত্তিক ব্রাহ্মণ্যধর্মের প্রচার গ্রন্থ। ব্রাহ্মণ্যধর্মের প্রচারকরা উপনিষদকে কেন এত আদরের বস্তু মনে করে তা বোঝার জন্য ‘উপনিষদ’ প্রকাশকের বক্তব্যের আশ্রয় নেওয়া যাক।

কলকাতার প্রকাশনী সংস্থা ‘হরফ প্রকাশনী’ কর্তৃক বাংলায় প্রকাশিত ‘উপনিষদ (অখণ্ড সংস্করণ)’ এর প্রকাশক উপনিষদ সম্পর্কে বলছেন : ‘উপনিষদের বাণী চিরন্তন, এর আবেদন শাশ্বত। কালপ্রবাহে এর ক্ষয় নেই, লয় নেই। উপনিষদের বাণীতেই ভারতবর্ষের চিরন্তন আত্মাদি বাঙ্ময় হয়ে উঠেছে। ভারতীয় দর্শন, ধর্ম ও সংস্কৃতির আকর গ্রন্থ এই উপনিষদ।’ এ হেন উপনিষদ সম্পর্কে সাধারণ হিন্দু কেন, শিক্ষিত হিন্দুর সিংহ ভাগের কোনো ধারণা নেই বললেই চলে। এমতাবস্থায় উপরোক্ত উপনিষদকে ভিত্তি করে এর একটা সংক্ষিপ্ত পরিচয় নিচে তুলে ধরা হল। উল্লেখ্য এটি করতে গিয়ে অনেক ক্ষেত্রে ঐ গ্রন্থের ভাষা হুবহু ব্যবহার করা হয়েছে ।

১. উপনিষদ জগৎ ও স্রষ্টা বিষয়ক চিন্তার প্রাচীন সাক্ষর:

এ কথা ভাবতে কষ্ট হয় না যে মানুষ সৃষ্টির আদিকাল থেকে জন্ম, মৃত্যু, রোগ-শোক, সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত থেকে শুরু করে বিশ্বজগতের নানাবিধ ঘটনা বিস্ময়ের সাথে অবলোকন করে আসছে। কিভাবে মানুষের জন্ম হচ্ছে, কেন মানুষ অসুস্থ হচ্ছে, কেন মানুষের মৃত্যু হচ্ছে, মৃত্যুর পর মানুষ কোথায় যাচ্ছে, সূর্য কোত্থেকে উদিত হচ্ছে, অস্তমান সূর্য কোথায় যাচ্ছে এসব বিষয় তার মনে নানা প্রশ্নের জন্ম দেয়। বলাবাহুল্য এসব প্রশ্ন জগৎ ও স্রষ্টা বিষয়ক াকে অধ্যাত্ব বিদ্যা বা ভগবদবিষয়ক বিদ্যা বলা হয়। ইতিহাসের প্রথম পর্যায়ে এ সম্বন্ধে মানুষ কী ভাবত তা আজ জানার উপায় নেই। কিন্তু নিকট অতীতে অর্থাৎ প্রাচীনকালে এ অঞ্চলের মানুষ এসব বিষয়ে কী ভাবত তার একটা ধারণা পাওয়া যায় বেদ ও উপনিষদ থেকে।

২. উপনিষদ শব্দের অর্থ:

বেদের বিভিন্ন জায়গায় জ্ঞানমূলক কিছু স্তোত্র/শোক/ঋক আছে। এগুলোকে একত্রে জ্ঞানকাণ্ড বা উপনিষদ বলা হয়। জ্ঞানকাণ্ডের বিষয়বস্তু ছাড়া বেদের আরও দুটো কাণ্ড আছে, যথা: সংহিতা ও ব্রাহ্মণ। সংহিতা ও ব্রাহ্মণে যাগ-যজ্ঞ প্রভৃতির বর্ণনা ও প্রণালী, উদ্দেশ্য, ফলশ্রুতি ও এদের দার্শনিক ব্যাখ্যা আছে। উপনিষদে এসব কিছু নেই। এতে আছে অধ্যাত্ম জ্ঞান যার ওপর হিন্দুধর্ম ও সংস্কৃতি দাঁড়িয়ে আছে বলে দাবি করা হয়।

‘উপনিষদ’ শব্দের অর্থ নিয়ে মতভেদ আছে। বেদের প্রান্তে বেদকে আশ্রয় করে গড়ে উঠেছে বলে একে ‘উপনিষদ’ বলা হয়। কারও কারও মতে ‘উপনিষদ’ অর্থ অবশ্য রহস্যগত জ্ঞান। আবার কেউ কেউ বলেন গুরুর নিকট বসে দার্শনিক বিদ্যা আয়ত্ত্ব করা হতো বলে এর নাম ‘উপনিষদ’। লক্ষণীয় ‘উপনিষদ’ অর্থে ‘বেদান্ত’ শব্দও ব্যবহৃত হয়। অর্থাৎ উপনিষদ ও বেদান্ত সমার্থক।

উপনিষদকে পরাবিদ্যাও বলা হয়। বেদের অপর অংশকে অপরাবিদ্যা বলা হয়। পরাবিদ্যা হচ্ছে বিশ্বরহস্যকে উদ্ধার করার জ্ঞান বা জ্ঞান বা বিদ্যা।

৩. উপনিষদ রচনাকাল:

উপনিষদের ক্রমিক রচনাকাল ও প্রাচীনত্ব সম্বন্ধে নিশ্চিত করে কিছু বলা যায় না। ড. রমেশ চন্দ্র মজুমদার রাধাকৃষ্ণণের মত উদ্ধৃত করে বলছেন, উপনিষদের রচনাকাল ১০০০ খ্রিস্ট-পূর্বাব্দ। অন্যান্যের মতে ৭০০ খ্রিস্ট পূর্বাব্দ ।

৪. উপনিষদ অরণ্যে বসে রচিত:

সংসার জীবনের ঊর্ধ্বে উঠে একশ্রেণির উদাসীন লোক অরণ্যে বসে উপনিষদ রচনা করেন। উদ্দেশ্য জীবনের গূঢ় অর্থ আবিষ্কার করা। গভীর ধ্যানের মাধ্যমেই তাঁরা এই জ্ঞান লাভ করেন। শিষ্যরা ধ্যানীদের পদপ্রান্তে বসে এই জ্ঞান লাভ করতেন। অরণ্যে ধ্যানলব্ধ জ্ঞান বলে উপনিষদকে ‘আরণ্যক’ও বলা হয়। মজার বিষয় এই জ্ঞানের বিষয়গুলো সাধারণত বেদের ব্রাহ্মণ’ ভাগের পরিশিষ্টে স্থান পেতো।

৫. উপনিষদের রচয়িতা:

ইতিহাসবিদ ড. রমেশ চন্দ্র মজুমদারের মতে বেদের কর্মকাণ্ড অর্থাৎ সংহিতা ও ব্রাহ্মণ অর্থাৎ যাগ-যজ্ঞানুষ্ঠান ইত্যাদি সম্পর্কিত শ্লোকগুলো রচনা করেছেন প্রধানত ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ের লোকেরা। অপরদিকে বেদের জ্ঞানকাণ্ড বা উপনিষদ অর্থাৎ দার্শনিক চিন্তামূলক শ্লোকগুলো রচনা করেছেন প্রধানত ক্ষত্রিয় ও অন্যজাতির লোকেরা।

৬. উপনিষদের সংখ্যা:

উপনিষদের সঠিক সংখ্যা নির্ধারণ করা একটি কঠিন কাজ। কারণ দিনদিন এর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। দেখা যাচ্ছে বৈদিককালের পরেও অনেক উপনিষদ রচিত হয়েছে। এমনকি মোগল আমলেরও অনেক উপনিষদ পাওয়া যায় । এমতাবস্থায় বৈদিক যুগের উপনিষদগুলোকেই প্রকৃত ও প্রাচীন উপনিষদ বলে ধরে নেয়া হয়। এ ধরনের চৌদ্দটি উপনিষদের কথা শঙ্করাচার্য তাঁর ভাষ্যে উল্লেখ করেছেন। অবশ্য হিসেবে দেখা যায় বেদের অঙ্গ হিসেবে গণ্য ও গণ্য হতে পারে এমন উপনিষদের সংখ্যা সর্বমোট মাত্র ১২টি। এর মধ্যে বেদের অঙ্গীভূত উপনিষদ ৮টি।

ঐতিহ্য অনুসারে বেদের সহিত সংযুক্ত উপনিষদ আরও ৪টি। নিচে এর তালিকা দেওয়া হল:

১২টি উপনিষদের তালিকা

বেদেও অঙ্গীভূত
=========
১. ঈশ
২. ঐতরেয়
৩. কৌষীতকি
৪. তৈত্তিরীয়
৫. বৃহদারণ্যক
৭. ছান্দোগ্য
৮. প্রশ্ন

ঐতিহ্য অনুসারে:
১. কঠ
২. শ্বেতাশ্বতর
৩. মন্ডুক
৪. মাণ্ডুক্য

উপরোক্ত ১২টি উপনিষদের মধ্যে ছয়টি প্রাচীনতম বলে বিবেচিত। এগুলো হচ্ছে:

ঐতরেয়, বৃহদারণ্যক, ছান্দোগ্য, তৈত্তিরীয়, কৌষীতকি এবং কেন। উল্লেখ্য, বেদান্ত দর্শনের আদিরূপ এই উপনিষদগুলোতেই পাওয়া যায়। অপরদিকে বাকি ছয়টি উপনিষদ, যথা: কঠ, শ্বেতাশ্বতর, ঈশ, মুণ্ডক, মাণ্ডক্য ও প্রশ্ন ইত্যাদিতে বেদান্তদর্শন বাদে সাংখ্য ও যোগ দর্শনের প্রভাব পরিলক্ষিত হয়।

উপনিষদের সর্বেশ্বরবাদী ধর্ম Isha Upanishad Verses 1 to 3 - Shukla Yajurveda, Sanskrit, Devanagari Script : Creative Common License Image from Wikipedia.org
উপনিষদের সর্বেশ্বরবাদী ধর্ম

৭. উপনিষদের প্রকারভেদ:

উপনিষদগুলোকে মোটামুটিভাবে তিন শ্রেণিতে ভাগ করা যায়, যথা: ক. প্রাচীন বা ব্রহ্মবাদী উপনিষদ, খ. যোগ বা সন্ন্যাসবাদী উপনিষদ ও গ. ভক্তিবাদী বা পৌরাণিক দেবতাবাদী উপনিষদ।

৮. উপনিষদের দর্শন:

হিরন্ময় বন্দোপাধ্যায়ের মতে ভারতীয় দর্শনে চারটি চিন্তরি স্তর আছে। প্রথমটি বেদের সংহিতা অংশের বহু দেবতাবাদ, দ্বিতীয় স্তরটি হচ্ছে বেদের উপনিষদ অংশের ‘সর্বেশ্বরবাদ, তৃতীয় স্তরটি হচ্ছে ষড় দর্শন যুগের জ্ঞানমার্গের মুক্তিবাদ এবং সর্বশেষ স্তরটি হচ্ছে পুরাণের যুগে ব্যক্তিরূপী ঈশ্বরকে ভিত্তি করে তৈরি ‘ভক্তিবাদ’। তা হলে দেখা যাচ্ছে উপনিষদের দর্শনটি ভারতীয় দর্শনের দ্বিতীয় স্তরের দর্শন অর্থাৎ ‘সর্বেশ্বরবাদ’। উপনিষদের ‘সর্বেশ্বরবাদ’ আলোচনার সুবিধার্থে উপরোক্ত চারটি দার্শনিক স্তরই বোঝা দরকার। নিচে এই স্তরগুলোর একটি পরিচয় তুলে ধরা হল:

ক. বেদের ‘বহু দেবতাবাদ’ :

আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, ৪টি বেদ দীর্ঘ সময় ধরে রচিত হয়েছে। বেদের প্রথম দিককার রচনায় অর্থাৎ সংহিতা অংশে ঋষিরা সৃষ্টি, দেবতা, জগৎ ইত্যাদি সম্বন্ধে যা ভেবেছেন তা থেকে বোঝা যায় তারা যেখানেই কোনো শক্তি বা সৌন্দর্য দেখেছেন তার ওপরই দেবত্ব আরোপ করেছেন। এভাবে অগ্নি, বরুণ, মরুৎ, ঊষা প্রভৃতি দেবতার উদ্ভব হয়েছে এবং তাদের উদ্দেশে ঋষিরা যজ্ঞ করেছেন। যজ্ঞের পাশাপাশি এই ধারণাও জন্ম নেয় যে বিশ্বকে বহু দেবতা নিয়ন্ত্রণ করছেন। বহুদেবতা নিয়ন্ত্রিত বিশ্বের পরিকল্পনা থেকে এই ধারণা গড়ে উঠে যে বিশ্ব একটি মাত্র নৈর্ব্যক্তিক মহাশক্তি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। এই শক্তিকে পুরুষ, আত্মা বা সৎ ইত্যাদি নামে ডাকা হয়েছে।

খ. উপনিষদের সর্বেশ্বরবাদ পরবর্তীকালে রচিত বেদের অংশে অর্থাৎ উপনিষদে বর্ণিত বিশ্বতত্ত্ব বলছে বিশ্ব হল সৃষ্টি এবং ব্রহ্ম হল স্রষ্টা। সৃষ্টি ও স্রষ্টা ওতপ্রোতভাবে জড়িত অর্থাৎ বিশ্বের মধ্যে বিশ্বশক্তি প্রচ্ছন্নভাবে ক্রিয়াশীল। সেই শক্তিই বিশ্বের আশ্রয় এবং সেই শক্তিই সমগ্রভাবে বিশ্বকে একত্বমণ্ডিত করেছে। বিশ্বশক্তি বিশ্বের মধ্যেই ছড়িয়ে রয়েছে। এই তত্ত্বই উপনিষদের ব্রহ্মবাদের মূল সুর। ব্রহ্ম সবকিছু ব্যাপ্ত করে আছেন, ব্রহ্ম সবকিছু ধারণ করে আছেন এবং সবকিছুর অন্তরে অধিষ্ঠান করছেন।

উপনিষদ মতে বিশ্ব একটি অঙ্গবিশিষ্ট অঙ্গীরূপে পরিকল্পিত; তা বিশুদ্ধভাবে এক নয়, সকলকে জড়িয়ে এক। তাতে বহু ও পৃথক পদার্থের সমাবেশ আছে, কিন্তু তারা একই ব্যাপক সত্তার মধ্যে বিধৃত। সেই সত্তা বিশ্বের বিভিন্ন অংশের মধ্যে প্রচ্ছন্নভাবে ক্রিয়াশীল থেকে বিশ্বকে নিয়ন্ত্রিত করে (তাই অন্তর্যামী) এবং দ্বৈতভাবে চিহ্নিত হয়ে বিচিত্ররূপে প্রকট হয়। এর অর্থ ঈশ্বর বিশ্ব হতে পৃথক নন। তিনি নৈর্ব্যক্তিক শক্তি। এটিই উপনিষদের ‘সর্বেশ্বরবাদ’।

ঋষিদের ঈশ্বর সম্বন্ধীয় জ্ঞান অন্বেষণ ‘বহুদেবতাবাদ’ থেকে ‘সর্বেশ্বরবাদে’ এসেই থেমে থাকেনি। পরবর্তীকালে ভারতীয় অধ্যাত্মদর্শনে আরও দুটো পরিবর্তন ঘটে। এ দুটো অধ্যাত্মদর্শন নিম্নরূপ:

ক. ষড়দর্শনের যুগ:

উপনিষদের ঋষিদের স্রষ্টা সম্বন্ধীয় জিজ্ঞাসা ছিল নিতান্তই কৌতূহলজাত ষড়দর্শনের যুগে ব্যবহারিক জীবনের প্রয়োজনের সাথে দর্শনকে সমন্বিত করা হয়। এ যুগে কর্মফল ভোগ ও তার জন্য জন্মান্তর গ্রহণের ধারণা বদ্ধমূল হয়। এর থেকে অর্থাৎ জন্মান্তর গ্রহণের বৃত্ত থেকে মুক্তির উপায় হিসেবে জ্ঞানমার্গকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। ষড়দর্শনে জ্ঞানমার্গের যেমন আধিপত্য, তেমনি বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মেও জ্ঞানমার্গের আধিপত্য। এ পর্যায়ের দর্শনে দেখা যায় সকলেই ঈশ্বরের অস্তিত্ব সম্পর্কে নীরব।

খ. ব্যক্তি-ঈশ্বর কেন্দ্রিক একেশ্বরবাদ :

সর্বশেষ পর্যায়ে দেখা যায় ঈশ্বরকে বিশ্বতত্ত্বের কেন্দ্রস্থলে স্থাপন করে তাঁর ওপর সকল মৌলিক শক্তি আরোপ করা হয় এবং তাঁকে ব্যক্তিসত্তারূপে কল্পনা করা হয়। ব্যক্তি ঈশ্বরকে ভক্তি করেই মুক্তিলাভ সম্ভব এটিই প্রচার করা হয়। বলা বাহুল্য এভাবেই রাম ও কৃষ্ণ দেবতার নষ্টি।

ইদানীংকালে আবার দেখা যায় রাম ও কৃষ্ণের স্থলে ‘লোকনাথ’ (ঘোষাল পদবিধারী এক ব্যক্তি) ও রামকৃষ্ণ (চট্টোপাধ্যায় পদবিধারী এক ব্যক্তি) নামীয় ব্যক্তিদের বসানোর চেষ্টা চলছে।

৯. উপনিষদের বাণীগুলো সুসংবদ্ধ নয়:

উপনিষদের বাণী নানা মুনি-ঋষি কর্তৃক বহুকাল ধরে বিভিন্ন সময়ে রচিত। এতে অন্যান্য দর্শনের মতো তথ্য ও যুক্তির অবতারণা খুবই কম। ঋষিগণ বিশ্বের সমস্যাকে যেভাবে দেখেছেন, এ সম্বন্ধে তারা যেভাবে চিন্তা করেছেন তাই কবিসুলভ ভাষায় লিপিবদ্ধ করে গেছেন। ফলে উপনিষদে সাজানো গুছানো কোনো বাণী নেই। বাণীগুলো নানা জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। তবে এতে ভাবধারার ঐক্য আছে বলে দাবি করা হয়। কিন্তু ভাবধারার এই কথিত ঐক্যকে সাজিয়ে দর্শন গড়ে তোলা এক কঠিন কাজ। এমতাবস্থায় উপনিষদ বোঝার জন্য নানা মতাবলম্বী টীকাকারের টীকার ওপর নির্ভর করতে হয়। এতে সাধারণ পাঠক, এমনকি শিক্ষিত পাঠকও উপনিষদের মূল ভাব কী তা নিয়ে বিভ্রান্তির সম্মুখীন হন।

১০. শংকরাচার্যের মায়াবাদ উপনিষদে অনুপস্থিত :

শংকরাচার্য পৃথক ঈশ্বরের অস্তিত্ব স্বীকার করেন না। তাঁর কাছে ঈশ্বর বিশ্বের সঙ্গে একীভূত। শংকরাচার্য বলেন, বিশ্বসত্তা অবিভাজ্য। এই মতকে ‘অদ্বৈতবাদ’ বলা হয়। এটি ‘মায়াবাদ’ বলেও পরিচিত। অর্থাৎ বিশ্ব ব্রহ্ম হতে পৃথক নয়, তাকে ভুল করে আমরা বহু আকারে দেখি। বিপরীতে উপনিষদ উক্ত মতবাদ বলে, বিশ্বের স্রষ্টা ও সৃষ্টি পৃথক। স্রষ্টার সাথে ভক্তিসূত্রে সৃষ্টির সম্বন্ধ স্থাপিত হয়। এরা মূলত একেশ্বরবাদী কিন্তু ঈশ্বরকে ব্যক্তিবিশিষ্ট রূপে বর্ণনা করে। এদেরকে বৈষ্ণবপন্থী বেদান্ত বলা হয়। এমতাবস্থায় বলা যায় ‘অদ্বৈতবাদ’ বা ‘মায়াবাদ’ উপনিষদের মূল ভাবধারার দ্বারা সমর্থিত নয়। প্রকৃতপক্ষে উপনিষদের কালে ব্যক্তিরূপী ঈশ্বরের কোনো ধারণাই গড়ে ওঠেনি

১১. উপনিষদ জীবনবিমুখ নয়:

ড. রমেশ মজুমদারের মতে উপনিষদের শিক্ষা মানুষকে জীবন বিমুখ করে না। বরং বলে পরিপূর্ণ জীবনের কথা যে জীবন জ্ঞান, কর্ম ও ভক্তি বা প্রেম দ্বারা ব্রহ্মের সাথে সর্বদাই যুক্ত।

১২. উপনিষদ সন্ন্যাসী হতে বলে না:

হিরন্ময় বন্দোপাধ্যায়ের মতে উপনিষদ কৃচ্ছ্রসাধন বা সংসার ত্যাগ করে সন্ন্যাসী হতে উপদেশ দেয় নি। বরং তাতে বলা হয়েছে ত্যাগ ও ভোগের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান করতে। ইন্দ্রিয় যা চায় তাকে বিসর্জন দিতে বলা হয় নি। বলা হয়েছে ইন্দ্রিয়কে নিয়ন্ত্রিত রাখতে যাতে শ্রেয় পথে চলা যায় শ্রেয় পথ হচ্ছে সামগ্রিক কল্যাণের পথ যা সমাজের মঙ্গল করে। এটি প্রেয় পথের বিপরীত। প্রেয় পথে নিজের স্বার্থই বড়। তাই ইন্দ্রিয় (বিষয় ইচ্ছা) দমনের প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন ইন্দ্রিয় নিয়ন্ত্রণের। উদাহরণস্বরূপ কঠ উপনিষদের কথা বলা যায়। এতে বলা হয়েছে ইন্দ্রিয় হচ্ছে অশ্বের মত বিষয়ের প্রতি প্রবল আকর্ষণ। শ্রেয়র পথে চলতে হলে ইন্দ্রিয়কে নিয়ন্ত্রিত রাখতে হবে।

১৩. উপনিষদ একা ভোগ করতে বলে না:

ঈশ উপনিষদে বলা হয়েছে স্বার্থপরের মত একলা ভোগ করতে নেই, ত্যাগের সাথে ভোগ করতে হয়, ভাগ করে ভোগ করতে হয়। কারণ বিশ্বের সকলেই আপনজন।

উপনিষদ্‌ সম্পর্কে আরো বিস্তারিত জানতে :

বাংলাদেশের খবর সাইটটি ব্যবহার করায় আপনাকে ধন্যবাদ। আমাদের সাথে যোগাযোগ করতে চাইলে “যোগাযোগ” আর্টিকেলটি দেখুন, যোগাযোগের বিস্তারিত দেয়া আছে।

Leave a Comment