চরমপত্র, এম আর আখতার মুকুল

চরমপত্র, মে মাস ১৯৭১ – এম আর আখতার মুকুল

চরমপত্র হলো এম আর আখতার মুকুল রচিত ও উপস্থাপিত স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সবচেয়ে জনপ্রিয় অনুষ্ঠান। চরমপত্র একটি অনুষ্ঠান যা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র চালু হওয়ার দিন ২৫শে মার্চ থেকে শুরু করে ১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার দিন পর্যন্ত প্রতিদিন প্রচারিত হয়েছে। চরমপত্র খ্যাত ব্যক্তি গেরিলা ১৯৭১ সাংবাদিক, লেখক, সম্পাদক এম আর আক্তার মুকুল,পুরো নাম মুস্তাফা রওশন আখতার মুকুল, যা আমাদের অনেকেরই অজানা।

বাংলাদেশের বিভিন্ন পরিক্ষায় প্রশ্ন আসে – চরমপত্র কি বা চরমপত্র কী ? চরমপত্র অর্থ কি ? চরমপত্র বলতে বোঝায় ?  চরমপত্র কে পাঠ করতেন? চরমপত্রে কি পাঠ করা হতো? চরমপত্র খ্যাত ব্যক্তি কে? চরমপত্রের শেষ দুটি লাইন কোন ভাষায় ছিল? মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশ বেতারের ভূমিকা, চরমপত্র পাঠ, চরমপত্র ও জল্লাদের দরবার, ইত্যাদি। এই আর্টিকেল গুলো পড়লে সেসব উত্তরও পরিস্কার হয়ে যাবে। চরমপত্র ডাউনলোড করা দরকার হলে, চরমপত্র pdf download খোঁজা দরকার নেই, এখান থেকেই কপি করতে পারবেন।

চরমপত্র, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র

মে মাস ১৯৭১

চরমপত্র,  ২৫ মে ১৯৭১ :

ঢাকা শহর ও নারায়ণগঞ্জ থেকে ভয়ানক দুঃসংবাদ এসে পৌঁছেছে। গত ১৭ই এবং ১৮ই মে তারিখে খোদ ঢাকা শহরের ছ’জায়গায় হ্যান্ড গ্রেনেড ছোঁড়া হয়েছে। এসব জায়গার মধ্যে রয়েছে প্রাদেশিক সেক্রেটারিয়েট, স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তান, হাবিব ব্যাংক, মর্নিং নিউজ অফিস, রেডিও পকিস্তান আর নিউ মার্কেট। পাকিস্তানী হানাদার সৈন্যদের দখলকৃত ঢাকা নগরীতে মুক্তিফৌজদের এধরনের গেরিলা তৎপরতা সামরিক জান্তার কাছে নিঃসন্দেহে এক ভয়ঙ্কর দুঃসংবাদ বৈকি।

তবে যে পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ সদম্ভে ঘোষণা করেছিলেন যে, ঢাকা নগরী সম্পূর্ণ করায়ত্ত আর জীবন যাত্রা ‘স্বাভাবিক’ হয়ে গেছে। তা’হলে মুক্তিফৌজদের এধরনের কাজকর্ম সম্ভব হচ্ছে কিভাবে? এছাড়া ঢাকা শহরে এর মধ্যেই নাকি মুক্তিফৌজের পক্ষ থেকে প্রচারপত্র পর্যন্ত বিলি করা হয়েছে। এই না বলে প্রশাসন ব্যবস্থা আবার চালু করা হয়েছে?

তা’হলে পাকিস্তানী জেনারেলদের নাকের ডগায় কীভাবে মুক্তিফৌজওয়ালারা প্রচারপত্র বিলি করতে পারে? আপনাদের ‘অশান্তি কমিটি’-মাফ করবেন, তথাকথিত ‘শান্তি কমিটির’ তথাকথিত নেতৃবৃন্দ করে কি? এদের ঘেটি ধরে active করতে পারেন না? জনসাধারণের উপর নাকি এদের দারুণ প্রভাব? এদের অংগুলি হেলনে নাকি বাংলাদেশ ওঠাবসা করছে!

না, না, না ও ব্যাপারে আপনারা কিস্সু চিন্তা করবেন না। আপনারা ভুল করে একটা সাধারণ নির্বাচন নিজেদের তত্ত্বাবধানে করিয়েছিলেন। আর সেই নির্বাচনে আপনাদের পৌ-ধরা নেতারা সব বাঙালিদের ‘বিশ্বাস ঘাতকতার জন্যে হেরে গেছে। বাংলাদেশের ভোটাররা সব মহাপাজী-একেবারে পাজীর পা-ঝাড়া। না হলে কক্সবাজারের ফরিদ আহমেদ, সিলেটের মাহমুদ আলী, চট্টগ্রামের ফ, কা, চৌধুরী, ঢাকার খাজা খয়েরউদ্দিন, মোহাম্মদপুরের গোলাম আজম আর পাকিস্তান অবজার্ভার হাউসের মাহবুবুল হকের মতো নেতারা নির্বাচনে হেরে যায়?

আর নির্বাচনে এরা হারলেই বা কি আসে যায়- এরা তো এক একজন বিরাট দেশপ্রেমিক। আমাদের ভবিষ্যৎ বংশধররা এদের নাম চমৎকারভাবে মীরজাফরের সঙ্গে পড়ে মুখস্থ রাখবে- তাই না? যাক্ যা বলছিলাম। ব্রাদার মিঠা খান, সরি জেনারেল মিঠা খান- একেই তো

এম আর আখতার মুকুল

দু’মাসের যুদ্ধে তোমার প্রায় হাজার কয়েক সৈন্য মারা গেছে, তার উপরে আবার

বাংলাদেশ দখলের যুদ্ধেরও সমাপ্তি ঘটাতে পারোনি। এবার খোদ শহরেই মুক্তিফৌজ ছোকড়াদের গেরিলা action! তাহলে কি বুঝবো তোমার সৈন্যরা মুক্তিফৌজ যোদ্ধাদের সামান্যতম ক্ষতি পর্যন্ত করতে পারেনি। ওকি আঁতকে উঠো না। ঢাকার আর্মানীটোলা আর কুর্মিটোলার সামরিক ছাউনির কাছে আজমপুর গ্রামে গেরিলারা যে টহলদার হানাদার সৈন্যদের হত্যা করেছে, সেকথা

কাউকে জানাবা না। কেমন কিনা, এবার খুশি হয়েছো তো। মরুভূমির উটপাখির মতো

তুমি মুখটা বালুর মধ্যে লুকিয়ে ফেলো, কেউই তোমাকে দেখতে পাবে না। ছিঃ ছিঃ ছিঃ। এতে লজ্জার কি আছে? খোদ ঢাকাতেই যখন গেরিলা action শুরু হয়েছে, তখন নারায়ণগঞ্জেও যে একটু বড় আকারে ওসব হবে তাতে সন্দেহ নেই। তাই নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদীর উপরে আভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন সংস্থার টার্মিনালটার ক্ষতি একটু বড় রকমেরই হয়েছে।

যাক লেঃ জেনারেল নিয়াজী এর মধ্যেই সামরিক হেলিকপ্টারে বাংলাদেশের কয়েকটা শহর সফর করে হানাদার সৈন্যদের মনোবল তৈরীর চেষ্টা করেছেন। কিন্তু তিনি যে আবার কয়েকটা খারাপ সংবাদ নিয়ে এলেন। বর্ষার আগেই হানাদার সৈন্যরা ক্যান্টনমেন্টে ফিরে যাবার জন্যে অস্থির হয়ে উঠেছে। কেননা মুক্তিফৌজের চোরাগোপ্তা মারের চোটে ওরা ছোট ছোট দলে টহল দেয়া বন্ধ করে দিয়েছে। বাংলাদেশের নদীর সাইজ দেখেই নাকি ওরা ভিমূরি খেয়ে পড়েছে।

মুক্তিযুদ্ধে চরমপত্র মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যাপক ভাবে অনুপ্রাণিত করতো।

মিঠা খান ভাইয়া। শুনলেও হাসি পায়। ঢাকার কাছে পালাতে তোমার নির্দেশেই তো হানাদার সৈন্যরা সাঁতার কাটা আর ছোট নৌকা চালানো শিখছে। আরে ও সাঁতার তো মায়ের পেট থেকে পড়েই শিখতে হয়। বাংলাদেশের ছেলেগুলো তো পাঁচ বছর বয়স থেকেই সাঁতার শেখে। এ তো আর পাঞ্জাবের এক হাঁটু পানিওয়ালা নদী নয় এ যে বিরাট দরিয়া। শুনেছি তোমার হানাদার সৈন্যরা যখন চাঁদপুর থেকে বরিশাল যাচ্ছিল তখন তারা ভেবেছিল তারা বোধ হয় বঙ্গোপসাগরে এসে গেছে।

ওদের একটু ভালো করে ভূগোল শিখিয়ে দিও- ওটা তো মেঘনা নদী। আর শোনো, একটা কথা তোমাকে গোপনে বলে দি। বাংলাদেশের বরিশাল ও পটুয়াখালী জেলা আর মাদারীপুর ও গোপালগঞ্জ মহকুমায় এক ইঞ্চি রেল লাইন কোনো সময়ই বসানো সম্ভব হয়নি। ওখানে অনেক নদীর নাম পর্যন্ত নেই- গ্রামের নামেই নদীর নাম। এসব এলাকার হাটগুলো পর্যন্ত নদীর উপরে বসে, বুঝেছ অবস্থাটা। এখানেই একটা নদী আছে- নাম তার আগুনমুখো। নাম শুনেই বুঝেছো বর্ষায় ওর কি চেহারা হবে?

না, না, তোমাকে ভয় দেখাবো না। একবার যখন হানাদারের ভূমিকায় বাংলাদেশের কাদায় পা ডুবিয়েছো- তখন এ পা আর তোমাদের তুলতে হবে না। গাজুরিয়া মাইর চেনো? সেই গাজুরিয়া মাইরের চোটে তোমাগো হগ্গলরেই কিন্তুক এই ক্যাদোর মাইধ্যে হুইত্যা থাকোন লাগবো।

[ চরমপত্র,  ২৫ মে ১৯৭১ – স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র ]

চরমপত্র, ২৬ মে মে ১৯৭১ :

সামরিক সাহায্যের বদৌলতে আধুনিক মারণাস্ত্রে পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর অবস্থা এখন একেবারে ছেরাবেরা হয়ে গেছে। বাংলাদেশে স্বাধীনতার অগ্নিমন্ত্রে সাড়ে সাত কোটি বাঙালিকে পদানত করতে পাকিস্তান সামরিক বাহিনী এরকম একটা বিপর্যস্ত অবস্থার সম্মুখীন হয়েছে। কুর্মিটোলা, ময়নমতী, যশোর, চট্টগ্রাম রংপুরের সামরিক ছাউনী এলাকার গোরস্তানগুলো পাকিস্তানের হানাদার জওয়ানদের কবরে ভরে গেছে।

এছাড়া বাংলাদেশের বিভিন্ন রণাঙ্গন থেকে হানাদারের করা পিআইএ বিমানে পাকিস্তানী সামরিক অফিসারদের কফিন পাকিস্তানে আত্মীয়স্বজনদের পাঠানো হচ্ছে। লাহোর, সারগোদা, লায়ালপুর, মুলতান, শিয়ালকোট, কোহাট, পেশোয়ার, কোয়েটা, লারকানা, শুক্কুর প্রভৃতি এসব কফিন পৌঁছানোর ঘরে কান্নার রোল গেছে।

মাত্র লড়াইয়ে বাংলাদেশে হানাদার পাকিস্তানী সামরিক বাহিনীর অফিসারসহ কয়েক হাজারের জওয়ান নিহত হয়েছে। সৈন্য আহত হয়েছে। তাই আজ বাংলাদেশে হানাদার অধিকৃত শহরগুলোতে রোজই সামরিক বাহিনীর সংগ্রহের টহল দিচ্ছে।

এম আর আখতার মুকুল

চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে বেপরোয়া হত্যালীলা চালিয়ে জেনারেল টিক্কা খান, জেনারেল মিঠা জেনারেল পীরজাদার দল বাংলাদেশকে পদানত করবার দেখেছিল, আজ ভেঙ্গে খান হয়ে গেছে। সমগ্র বাংলাদেশব্যাপী মুক্তিযোদ্ধাদের তৎপরতায় হানাদার সৈন্যের অস্থির হয়ে উঠেছে। অতর্কিত আক্রমণে প্রতিদিনই ঢাকা শহরের আর্মানীটোলায় আর কুর্মিটোলার অদূরে আজমপুর গ্রামে টহলদারী সৈন্যদের দল নিশ্চিহ্ন

এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময়ে কুর্মিটোলার সামরিক ছাউনীতে শোকের ছায়া এল। একদল সৈন্য অনার দেখাবার জন্য নিলো। আখাউড়া সেক্টর থেকে হানাদারদের গোটা কয়েক সাঁজোয়া গাড়ি মন্থর গতিতে আর ময়নামতীর উপর দিয়ে দাউদকান্দি ঢাকার দিকে এগিয়ে কাচপুরের ফেরি পার বাওয়ানী মিলের দিয়ে যাত্রাবাড়ীর দিয়ে ঢাকা হাটখোলায় প্রবেশ করলো। প্রায় জনশূন্য ঢাকার রাস্তায় দু’চারজন পথচারী কনভয়টা মন্থর যাওয়ায় অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে দেখলো।

গাড়িটার কনভয়টা ধীরে ধীরে বিধ্বস্ত ঢাকা নগরীর মাঝ দিয়ে মন্থর গতিতে এগিয়ে গেল। মাঝে মাঝে রাস্তার দু’ধারে টহলদারী সৈন্যরা ‘এ্যাটেনশন পজিশনে’ স্যালুট দিয়ে সম্মান দেখাচ্ছে। শেষ অবধি কনভয়টা এয়ারপোর্ট হয়ে কুর্মিটোলার সামরিক ছাউনিতে গিয়ে হাজির হলো। সমগ্র এলাকায় নীরবতা নেমে এল। এরপর শুরু হলো আনুষ্ঠানিক সম্মান প্রদর্শন।

আবার কনভয়টা এগিয়ে চললো তেজগাঁ বিমান বন্দরের দিকে। বিমান বিধ্বংসী কামান, মর্টার, ট্রেঞ্চ আর বাংকার দিয়ে ঘেরাও করা বিমান বন্দরে যখন কনভয়টা গিয়ে পৌঁছলো তখন বিকেলের পড়ন্ত রোদ এসে দাঁড়িয়ে থাকা পিআইএ বিমানের উপর পড়ে চক্ চক্ করছিল। এমন সময় জেনারেল মিঠা খান এসে কফিনে রাখা লাশটার প্রতি সম্মান দেখালো। একটু পরেই বিমানটা স্বদেশে রওনা হলো।

এই বিমানেই ফিরে গেলেন পাকিস্তান আর্টিলারী ডিভিশনের কমান্ডিং অফিসার নওয়াজেশ আলী। তিনি করাচী হয়ে লাহোরে তাঁর স্ত্রী-পুত্র-পরিজনের মাঝে ফিরে গেলেন। তবে জীবিত অবস্থায় নয়। ঐ কফিনটাতেই নওয়াজেশের লাশ রয়েছে। আখাউড়া সেক্টরে তিনি যখন একটা জিপে করে রুটিন-ভিজিটে বেরিয়েছিলেন, তখন অসীম সাহসী মুক্তিযোদ্ধারা একটা ঝোপের আড়ালে বসে তাঁকে হত্যা করতে সক্ষম হয়।

শুধু নওয়াজেশ কেন, গত দু’মাসে পাকিস্তান আর্মির বেশ কিছু কমিশন্ড অফিসারের লাশ বিমানযোগে দেশে পাঠানো হয়েছে। অবশ্য যে হাজার কয়েক আর্মি জওয়ান এর মধ্যেই বাংলাদেশে নিহত হয়েছে তাদের লাশ তো আর স্বদেশে পাঠানোর প্রশ্ন ওঠে না। ওদের লাশ বাংলাদেশেই দাফন করা হচ্ছে। এছাড়াও গত দু’মাসে কয়েক হাজার পাক সৈন্য মুক্তিফৌজের হাতে প্রচণ্ড মারের মুখে আহত হয়ে কাতরাচ্ছে।

এদের জন্যে বাংলাদেশের বেসামরিক লোকদের জোর করে ধরে ধরে রক্ত সংগ্রহ করা হচ্ছে। কিন্তু তবুও পাকিস্তান আর্মি বাংলাদেশে আর হালে পানি পাচ্ছে না। পাকিস্তানের মোট তেরো ডিভিশনের মধ্যে চার ডিভিশন সৈন্য বাংলাদেশে লড়াই করছে। কাশ্মীর ও পশ্চিম পাকিস্তানের সীমান্ত এলাকা থেকে আর সৈন্য উঠিয়ে বাংলাদেশে আনা সম্ভব নয়।

এদিকে বাংলাদেশেও দ্রুত সৈন্য ক্ষয় হচ্ছে। তাই এখন সেনাপতি ইয়াহিয়া পশ্চিম পাকিস্তান থেকে মিলিশিয়া বাহিনীদের ‘কাফের নিধনের’ কথা বলে বাংলাদেশে পাঠাচ্ছে। কিন্তু এখানে যুদ্ধ জয়ের কোনো আশা নেই দেখে আর মুক্তিফৌজের গেরিলা যুদ্ধের দাপটে এদের মনোবল একেবারেই ভেঙ্গে পড়েছে। তাই বলছিলাম বাংলাদেশে পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর অবস্থা একেবারে ছেরাবেরা হয়ে গেছে।

চরমপত্র, ২৭ মে ১৯৭১ :

ঢাকার সংবাদপত্রগুলোর এখন কুফা অবস্থা। পাঞ্জাবের মেজর সিদ্দিক সালেক এ সমস্ত দৈনিক পত্রিকাগুলোর প্রধান সম্পাদকের আসন অলঙ্কৃত করে রয়েছে। কেননা এই মেজর সালেকই হচ্ছেন বাংলাদেশে হানাদার বাহিনীর আর্মি পি.আর.ও। ঢাকার

সংবাদপত্র ছাড়াও বেতার টিভির উপর তার দোর্দণ্ড প্রতাপ। মেজর সালেক প্রত্যেকটি সংবাদের উপর সেন্সরড ও পাসড সিল দিয়ে দস্তখত করলে খবরের কাগজগুলো তা’ছাপাতে পারছে। অবশ্য তিনটা পত্রিকার সম্পাদকের এতে যায় আসে না। কেননা এরা দৈনিক পত্রিকার সম্পাদক হওয়া সত্ত্বেও কোনো দিনই সম্পাদকীয় নিবন্ধ লেখেন নি। তাই বলে ভাববেন না যে, এ দু’জনের লেখার ক্ষমতা অদ্ভূত কেবল ইচ্ছে করেই লিখছেন না। আসলে এরা দু’জন ঐ লেখার বিদ্যেটা ছাড়া আর সব কিছুতেই পারদর্শী।

এদের একজনের আদি নিবাস ভারতের বিহার প্রদেশে। নাম- এস.জি.এম. বদরুদ্দিন। ইনিই হচ্ছেন পাকিস্তান সরকার পরিচালিত প্রেস ট্রাস্ট মালিকানার ইংরেজি দৈনিক মর্নিং নিউজ পত্রিকার সম্পাদক। মাস কয়েক আগে এই বদরুদ্দিনই মর্নিং নিউজের ঢাকা ও করাচী এ দু’টো এডিশনের প্রধান সম্পাদকরূপে নিযুক্ত হয়েছেন।

এর কৃতিত্ব হচ্ছে, গত পনেরো বছরের মধ্যে ইনি কোনো সম্পাদকীয় নিবন্ধ লেখেননি। বিদ্যার দৌড় পেটে বোমা মারলে বোমাটাই ভোঁতা হয়ে ফিরে আসবে। কিন্তু তবুও ইনি ইংরেজি মর্নিং নিউজ পত্রিকার সম্পাদক। তাহলে এর আর কি কি যোগ্যতা রয়েছে? প্রথমতঃ ইনি হচ্ছে উর্দুভাষী আঠার বছর ঢাকায় বসবাস করা সত্ত্বেও বাংলা বলতে বা পড়তে পারেন না।

দ্বিতীয়তঃ পাকিস্তানের সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক দল অর্থাৎ পাকিস্তান আর্মির এজেন্ট। আর তৃতীয়তঃ ইনি একটু তরল জাতীয় পদার্থ পানে অভ্যস্ত।

আরেকজন সম্পাদক ফেনী নিবাসী বঙ্গভাষী। কেবলমাত্র লেখার বিদ্যাটা ছাড়া ইনি সমস্ত রকমের বিদ্যায় পারদর্শী। ইনি একদিকে শ্রমিক নেতা ও রাজনীতিবিদ। অন্যদিকে ইনি একজন টাউট সম্প্রদায়ের লোক। ইনিই হচ্ছেন পাকিস্তান অবজার্ভার পত্রিকার বাংলা সংস্করণ দৈনিক পূর্বদেশের সম্পাদক মাহবুবুল হক।

আজ পর্যন্ত জনাব হক পূর্বদেশ পত্রিকায় সম্পাদকীয় নিবন্ধ লেখা তো দূরের কথা, একটা মফস্বল সংবাদ পর্যন্ত লিখতে পারেননি। অর্থাৎ কিনা লেখার ক্ষেমতা নেই। তবে হ্যাঁ ইনি একজন শ্রমিক নেতা। রেলওয়ে এমপ্লয়িজ লীগের সভাপতি হিসেবে বছরের পর বছর ধরে বাংলাদেশের শ্রমিক আন্দোলনে ইনি যেভাবে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন, তা মীরজাফরকেও হার মানিয়ে দেয়। এই মাহবুবুল হকের বদৌলতেই বাংলাদেশের রেলওয়ে কর্মচারীরা তাদের ন্যূনতম অধিকার পর্যন্ত আদায় করতে পারেনি।

জনাব মাহবুবুল হক একজন রাজনৈতিক নেতাও বটে। ইনি মনেপ্রাণে একজন খাঁটি জামাতে ইসলামী। অবশ্য নামাজ রোজার বালাই পর্যন্ত নেই। কিন্তু বন্ধু সমাজে ইনি নিজেকে প্রগতিশীল বলে দাবি করে থাকেন। সত্তুরের সাধারণ নির্বাচনে জনাব হক তার মুনিব আর পাকিস্তানের ক্লিক রাজনীতির সদস্য হামিদুল হক চৌধুরীর নির্দেশে ফেনীর একটা আসন থেকে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন।

জনাব মাহবুব ফেনীতে খুবই জনপ্রিয় কিনা! তাই মাত্র হাজার খানেক ভোটের জন্য তার জামানতটা রক্ষা পেয়েছে। তার সবচেয়ে বড় যোগ্যতা হচ্ছে, তিনি পাকিস্তান আর্মির খুবই আস্থাভাজন লোক। মেজর সালেকের মতো লোকদের সংগে তার বহু আগে থেকেই নিবিড় সম্পর্ক ছিল। অবশ্য বিদেশী দূতাবাসের লোকদের সংগে তার দহরম মহরম রয়েছে।

এছাড়া দৈনিক পাকিস্তানের সম্পাদকের কথা না-ই বা বললাম। এই পত্রিকার সম্পাদক জনাব আবুল কালাম শামসুদ্দিন অনেকদিন আগে থেকেই নিজেই নিজেকে চিঠিপত্র লিখছেন। অর্থাৎ কিনা পত্রিকার সম্পাদকীয় লেখার ব্যাপারটা উনি জুনিয়রদের উপর ছেড়ে দিয়ে সম্পাদকের কাছে চিঠিপত্র লেখার দায়িত্ব নিয়েছেন। সে এক অদ্ভূত ব্যাপার! রোজ এই বৃদ্ধ ভদ্রলোক দোতলার কোণার ঘরটাতে বসে চিঠিপত্র তৈরী করছেন আর নিজের পত্রিকায় ছাপাচ্ছেন।

তাই বলছিলাম, ঢাকার পত্রিকাগুলোর এখন এক কুফা অবস্থা। এসব সংবাদপত্রগুলো এখন হানাদার বাহিনীর কুক্ষিগত। হানাদার বাহিনীর তাবেদাররাই এখন সংবাদপত্রগুলো নিয়ন্ত্রণ করছে। অবশ্য যে ক’টা দৈনিক পত্রিকা বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের কথা ছাপাতো সেসব পত্রিকাগুলোর ছাপাখানা, মায় অফিস ভবন পর্যন্ত কামানের গোলায় নিশ্চিহ্ন করা হয়েছে। আর এদিকে দালাল মার্কা সংবাদপত্রগুলো চার থেকে ছ’পৃষ্ঠাওয়লা ইস্যু বের করে দালালীর প্রতিযোগিতা করছে।

এরা কয়েকটা জায়গায় স্টাফ রিপোর্টার পাঠিয়ে ‘অবস্থা স্বাভাবিক’ বলে খবর ছাপানোর প্রচেষ্টা করছে। কিন্তু কি লাভ? এখন ঢাকায় গড়ে একটা খবরের কাগজের প্রচার সংখ্যা এক থেকে দেড় হাজারের মতো। কেননা ঢাকায় কাগজ কেনার মতো লোক কই? আর মফস্বলের সঙ্গে ঢাকার তো কোনো যোগাযোগ ব্যবস্থাই নেই। অবজার্ভার গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স এর মধ্যেই তো ছাঁটাই-এর নোটিশ দিয়েছে।

ভাই ঢাকার পত্রিকাগুলোর সুপ্রিম সম্পাদক মেজর সালেকের কাছে একটা আরজ, যে কোনো একটা খবরের কাগজের ছাপাখানা থেকে তো সমস্তগুলো কাগজই ছাপার ব্যবস্থা করা যায়। কেবল এক দেড় হাজার করে ছাপা হবার পর কাগজের নামের হেড পিস্‌টা বদলে দিলেই তো চলে। খামোখা প্রতিদিন তকলিফ করে জিপে চড়ে প্রত্যেকটা খবরের কাগজ অফিসে ঘুরে বেড়াবার কষ্ট করছেন। পালের গোদা হামিদুল হক চৌধুরীর কাছ থেকে একটা advice নিন। কাজ দিবে।

এই চৌধুরী সাহেবের advice ই তো পূর্বদেশের প্রেস ম্যানেজার আহসান উল্লাহ সেদিন কল্যাণপুরে বাসার অবস্থা দেখতে যেয়ে বিহারীদের হাতে নিহত হলো। পরে লাশ উদ্ধার করে অফিসে নিয়ে আসলে চৌধুরী সাহেব শুধু একটা কথাই বলেছিলেন, “ভালো করে লাশ সনাক্ত করেছো তো? লাশটা কি ঠিকই আহসান উল্লার?”…হত্যাকারী কাকে বলবো?

চরমপত্র, ২৮ মে ১৯৭১ :

ঠ্যালার নাম জশমত আলী মোল্লা। সেনাপতি ইয়াহিয়া এখন ঠ্যালার মুখে পড়েছেন। কেননা বিদেশী মারণাস্ত্রে বলীয়ান হয়ে ইয়াহিয়ার ইঙ্গিতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী তার সমস্ত শক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েও বাংলাদেশকে দখল করতে ব্যর্থ হয়েছে। তাই heeহেএ।

ইয়াহিয়ার এখন চিড়ে চ্যাপ্টা অবস্থা। হাজার হাজার হানাদার জওয়ানদের হতাহত হবার সংবাদ এখন পশ্চিম পাকিস্তানে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে সেখানে দারুণ- উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। সেখানকার সংবাদপত্রের উপর পূর্ণ সেন্সরশিপ থাকা সত্ত্বেও এরা বিদেশী সংবাদপত্রে প্রকাশিত কিছু কিছু খবর পুনমুদ্রিত করাতেই এই বিদিকিছছি অবস্থা দেখা দিয়েছে।

এছাড়া প্রতিদিনই পি, আই, এ, বিমানে পাকিস্তান সামরিক অফিসারদের লাশ পশ্চিম পাকিস্তানে তাদের আত্মীয়স্বজনদের কাছে পৌঁছাচ্ছে বলে পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে উঠেছে। লাহোরের ‘মিয়ানী সাহেব কবরস্থানে’ রোজই বাংলাদেশ থেকে এসব নিয়ে আসা লাশ দাফন করা হচ্ছে। তাই আজ পাঞ্জাবের ঘরে ঘরে কান্নার মাতম্ পড়ে গেছে।

সেনাপতি ইয়াহিয়া এ অবস্থার মোকাবিলা করতে যেয়ে সেখানকার সংবাদপত্রের উপর দারুণভাবে ক্ষেপে গেছেন। এমনকি লাহোরের সরকার পরিচালিত পাকিস্তান টাইমস এবং ইমরোজ, জামাতে ইসলামীর ‘নওয়ায়ে ওয়াক্ত’ আর ভুট্টো সমর্থক ‘মুসাওয়াৎ’ পত্রিকার উপর সামরিক বিধি জারি করেছেন।

কেননা এসব কাগজগুলো বাঙালি হত্যার ষড়যন্ত্র ‘জি হুজুরের মতো সমর্থন করলেও, এদের প্রোপাগাণ্ডা লাইনটা গড়বড় হয়ে গেছে। আর এর ফলেই পশ্চিম পাকিস্তানে একথা ফাঁস হয়ে গেছে যে, বাংলাদেশে মুক্তিফৌজের হাতে হানাদার সৈন্যরা বেধড়ক মাইর খাচ্ছে আর এ ধরনের গাবুর মাইরের চোটে পাক সেনারা একেবারে ‘ঘাউয়া’ হয়ে উঠেছে।

তাই সেনাপতি ইয়াহিয়া এখন লাহোরের চারটা সংবাদপত্রের সম্পাদকদের সামরিক আইনে বিচারের কথা ঘোষণা করেছেন। হায়রে দালালী! ‘যার লাইগ্যা চুরি করি সেই কয় চুর’। নিয়তির বিধান কে খণ্ডাতে পারে! ইয়াহিয়ার সমস্ত দালালদের খুব শিগগিরই এ ধরনের অবস্থায় পড়তে হবে।

এদিকে পশ্চিম পাকিস্তানের যেসব শিল্পপতি আর ব্যবসায়ীর দল মাত্র মাস দু’য়েক আগেও হত্যালীলা চালিয়ে বাংলাদেশের বাজার ঠিক রাখার উদ্দেশ্যে জেনারেল ইয়াহিয়াকে সমর্থন জানানোর জন্য প্রাণ জারে জার করেছিল, তারা এখন নাখোশ হয়ে উঠেছেন। কেননা গত দু’মাস ধরে পশ্চিম পাকিস্তানের কোনো শিল্পজাত দ্রব্য আর বাংলাদেশের বাজারে পাঠানো সম্ভব হয়নি।

সেখানকার মিলের গুদামগুলো তৈরি মালে পাহাড় হয়ে রয়েছে। ফলে শ্রমিক ছাঁটাই শুরু হয়ে গেছে। এছাড়া অনেকগুলো কলকারখানা বাংলাদেশের কাঁচামালের অভাবে লালবাতি জ্বালিয়েছে।

পাকিস্তানের বৈদেশিক বাণিজ্যে এক ভয়াবহ রকমের ‘গ্যানজাম’ দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ থেকে কাঁচাপাট আর পাটজাত দ্রব্যের রফতানী একেবারে বন্ধ হয়ে গেছে। চা আর চামড়ার সরবরাহ নেই বললেই চলে। তাই বাংলাদেশের দখলকৃত এলাকা থেকে গত দু’মাস ধরে কোনো রফতানী না হওয়ায় পাকিস্তানের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের ক্ষেত্রে এক মারাত্মক বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়েছে। আর এরই ফল হিসেবে পশ্চিম পাকিস্তানে বিদেশী জিনিষপত্র আমদানী দারুণভাবে নিয়ন্ত্রিত করা হয়েছে।

শুধু তাই-ই নয়, লজ্জার মাথা খেয়ে পাকিস্তানের সামরিক জান্তা পরিস্কারভাবে বিশ্বকে জানিয়ে দিয়েছে যে, আগামী নভেম্বর মাসের আগে পাকিস্তানের পক্ষে ধার পরিশোধের কোনো কিস্তি দেয়া অসম্ভব। এমনকি সুদ পর্যন্ত পরিশোধ করা সম্ভব নয়।

বাংলাদেশে যুদ্ধ চালাতে যেয়ে পাকিস্তান সরকারকে প্রতিদিন দেড় কোটি টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে বলে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। তাই সেনাপতি ইয়াহিয়ার চ্যালা এম.এম. আহম্মদ ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে যেকোনো শর্তে পশ্চিমা দেশগুলো থেকে টাকা ধার নেয়ার জন্যে এখন দরজায় দরজায় ‘ল্যালপার’ মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে।

কোনো কোনো দেশ অবিলম্বে বাংলাদেশের সঙ্গে একটা রাজনৈতিক সমঝোতায় আসার জন্য পরামর্শ দেয়ায় আহম্মদ সাহেব তার মুনিব সেনাপতি ইয়াহিয়ার কাছে জরুরি আঞ্জম পাঠিয়েছেন। আর অমনি ‘সোনার চাঁদ পিতলা ঘুঘু’ ইয়াহিয়া ঘোষণা দিয়েছেন যে, ‘হে আমার বেরাদারানে বঙ্গাল, আপনারা যারা সীমান্তের ওপারে চলে গেছেন, তাঁরা তখলিফ করে হানাদার দখলকৃত এলাকায় ফিরে আসুন।

পাক সেনারা বাংলাদেশের শহর এলাকায় হত্যা করার মতো নিরস্ত্র লোকদের হাতের কাছে না পেয়ে পেরেশান হয়ে উঠেছে।’ কিন্তু দিন কয়েক অপেক্ষা করেই খান সাহেব বুঝলেন যে, হ্যাঁ কিছু বাঙ্গালি দখলকৃত শহরগুলাতে ফিরে এসেছে বৈকি। তবে তাঁরা নিরস্ত্র নয়- তাঁরা হচ্ছেন সশস্ত্র গেরিলা যোদ্ধার দল। সাদা পাকা মোটা ভ্রূ দুটো খান সাহেবের আবার কুঁচকে উঠলো।

একটা সাংবাদিক সম্মেলন আহ্বান করে বললেন, স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে এলেই ‘দেশপ্রেমিক নির্বাচিত সদস্যদের হাতে ক্ষ্যামতা হস্তান্তর করা হবে।’

কেন আবার কি হলো? পরাজিত রাজনৈতিক নেতাদের হাতে ক্ষমতা দেওয়ার ক্ষ্যামতা হলো না? এইনা বলে বাংলাদেশে ক্ষমতা নেয়ার মতো কেউই নেই? এই না বলে আওয়ামী লীগাররা রাষ্ট্রদ্রোহী আওয়ামী লীগারদের হাতের কাছে পেলে শির কুচাল দেঙ্গা? তাই আওয়ামী লীগ বেআইনী ঘোষণা করেছো? তাহলে আবার দেশপ্রেমিক আওয়ামী লীগারদের খুঁজে বেড়াচ্ছ কেন?

হায়রে ইয়াহিয়া! কত কেরামতি না তুমি জানো! বাম্বু চেনো? এখন বুঝি বায়ু এসেছে। আর সেই বাম্বুর ঠ্যালায় কেরামতি দেখাচ্ছো? কিন্তু বাপধন- ময়না আমার কোনো কেরামতিই যে আর কাজে লাগবে না। এখন বুঝি চান্দি গরম হইছে। আর হেই গরম চান্দি লইয়া পাগল অইয়া তুমি আবোল তাবোল কইতাছো! কিন্তুক একটা কথা কইয়া দেই- ঠ্যালা চেনো? হেই রাম ঠ্যালার নাম কিন্তুক জশমত আলী মোল্লা বুঝছো?

চরমপত্র, ২৯ মে ১৯৭১ :

জেনারেল ইয়াহিয়া খান এখন ঝিম্ ধরেছেন। বাঙালি জাতিকে পদানত করবার সমস্ত প্ল্যান আর ফর্মূলা বানচাল হয়ে যাওয়াতেই জেনারেলের এই অবস্থা হয়েছে। বাংলাদেশে বর্বর আক্রমণ শুরু করবার পর পাকিস্তানের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা একেবারে ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম হওয়াতে সেনাপতি ইয়াহিয়া এখন চেখে সরিষার ফুল দেখতে পাচ্ছেন। চারপাশটা কেমন যেন হলদে হয়ে যাচ্ছে।

এছাড়া তরল জাতীয় পদার্থের মাত্রাধিকা ঘটায় তাঁর চোখের সামনে সবকিছু যে ঝাপসা হয়ে আসছে। এখন তিনি ভুট্টো সাহেবকে না চেনার ভান করছেন। বেচারা ভুট্টো সেদিন করাচীতে এক সাংবাদিক সম্মেলনে আসোস করে বলেছেন যে, ইসলামাবাদের এখনকার কায়-কারবার পিপলস পার্টির অজ্ঞাতেই চলছে।

অথচ আগের ওয়াদামতো আওয়ামী লীগ বেআইনী ঘোষণা করার পর পিপলস পার্টিকেই ৩০শে জুলাই-এর মধ্যেই ক্ষমতা দেয়ার কথা।’ ক্ষমতার লোভে ভুট্টো সাহেব এখন ষড়যন্ত্রের কথা ফাঁস করে দিয়েছেন। কিন্তু ভুট্টো সাহেব একটা কথা ষড়যন্ত্র রাজনীতিতে যাঁর জন্ম- ষড়যন্ত্রের মধ্যেই যে তার মৃত্যু! তাই এখন আর কাউ কাঁউ করে লাভ কি?

এদিকে আগায় খান পাছায় খান- খান আব্দুল কাইউম খান আবার খুলেছেন, মাফ্ করবেন ‘মুখ’ খুলেছেন। তিনি আবদার করেছেন- আবার আদমশুমারী করে নির্বাচন করতে হবে। অবশ্য তিনি ইসলামাবাদের সামরিক কর্তৃপক্ষকে আরও ক’টা দিন সবুর করতে বলেছেন। কেননা ‘দন্তবিহীন সীমান্ত শার্দুল’- খান কাইউম খান পরিস্কারভাবে ঘোষণা করেছেন যে, বাংলাদেশ থেকে আরও কিছু বাঙালিকে উচ্ছেদ করবার পর আদমশুমারী ও নির্বাচন করতে ।

আয় মেরে জান, পেয়ারে দামান, খান কাইউম খান, তোমার ক্যারদানী আর কত দেখাবে?

মনে নেই তুমি যখন সীমান্ত প্রদেশের পেরধান মন্ত্রী ছিলে, তখন সেখানকার সাধারণ নির্বাচনে তোমার মনোনীত প্রার্থীরা এক একটা এলাকায় মোট ভোটার সংখ্যা থেকেও বেশি ভোট পেয়েছিল? কিন্তু সত্তুরের নির্বাচনে তোমার মুরুব্বী পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে যে নির্বাচন হয়েছে তাতে বাংলাদেশে তোমার পার্টির প্রার্থীদের অবস্থা একেবারে ছেছছেরা হওয়াতেই কি তোমার উর্বর মস্তিষ্কে নতুন প্ল্যান গজাচ্ছে? কি বুদ্ধি তোমার? এত বুদ্ধি নিয়ে রাতে তুমি ঘুমাও কেমন করে?

জামাতে ইসলামীর জেনারেল সেক্রেটারী তোফায়েল আহমদ আরও এক ডিগ্রি এগিয়ে গেছেন। ইনি ধূয়া তুলেছন প্রথম নির্বাচনের ভিত্তিতে আবার সাধারণ নির্বাচন করতে হবে। এ যেন বাচ্চা মেয়েদের এক্কা দোক্কা খেলা আর কি? থুক্কু দিলেই- ফেন্ পহলেসে।

কিন্তু তোফায়েল আহমদ ভাইয়া; sorry মাওলানা তোফায়েল, পশ্চিম পাকিস্তানে আপনারা যা খুশি তাই করতে পারেন; আপনাদের খাসী ইচ্ছে করলে আপনারা লেজ দিয়ে জবাই করতে পারেন- তাতে আমাদের কিস্সু যায় আসে না। কিন্তু দোহাই আপনার, বাংলাদেশের ব্যাপারে আর মাথা গলাবেন না।

এবারের সাধারণ নির্বাচনে তো আপনাদের Candidate দের অবস্থাটা দেখেছেন? এমনকি মীরপুর-মোহাম্মদপুরের অবাঙ্গালি এলাকা থেকেও আপনার জামাতে ইসলামীর মাইনে করা আমীর গোলাম আজম পর্যন্ত ধরাশায়ী হয়ে পড়লেন। বাংলাদেশের মাটি খুবই পিছলা কিনা? কয়েক কোটি টাকা খরচ করার পরেও তো একজন প্রার্থীও নির্বাচিত করাতে পারলেন না। এই দুঃখেই কি এখনও পর্যন্ত সিনা চাপড়াচ্ছেন?

কিন্তু এদিকে যে, আপনাগো নেতা সেনাপতি ইয়াহিয়া এখন উল্টা-পাল্টা কথা বলতে শুরু করেছেন। সেদিন ভট্ করে এক সাংবাদিক সম্মেলনে বলেই বসলেন, ‘শেখ মুজিব আমাকে গ্রেফতার করতে চেয়েছিলেন।’ সম্মেলনে হাজির থাকলে বলতাম, ‘একটু আস্তে কন। ঘোড়ায় হুন্‌লে হাইস্যা দিবো।’ শুধু এখানেই শেষ নয়, ইয়াহিয়া চমৎকার।

মাটিতে পড়ে গেল। ধ্যাত্তারি না। পূর্ব বাংলা থেকে তো ১৫৯-এর মধ্যে ১৬৭টা নির্বাচিত সদস্যই আওয়ামী লীগার। হাতের কাছে যে সব বাঙালি নেতা পাচ্ছি, সব ব্যাটাই তো হারু মিয়ার দল। সঙ্গে সঙ্গে নতুন ফরমান এল- আওয়ামী লীগারদের মধ্যে সবাই খারাপ নয়- দু’চারটা সেই জিনিস পাওয়া যেতেও পারে। বহু খোঁজাখুঁজির পর আড়াইজন পাওয়া গেল। এখন উপায়?

এবার আগাশাহীর কাছ থেকে ‘মেসেজ’ এল। যদি কোনোমতে বাঙালি শরণার্থীদের ফিরিয়ে আনা যায়। তবে পশ্চিমা দেশ থেকে সাহায্যের ফোয়ারা আসবে। অমনি সেনাপতি ইয়াহিয়া ইয়া-ইয়া করে উঠলেন। করাচীর এক সাংবাদিক সম্মেলনে গলাটাকে একটু Base-এ এনে অক্করে কাইন্দা হালাইলেন। লজ্জার মাথা খেয়ে বাঙালি শরণার্থীদের ফিরে আসবার আবেদন জানালেন।

কিন্তু হিসেবে একটু ভুল হয়ে গেছে গোলাম হোসেন। কেননা করাচীর সাংবাদিক সম্মেলনে যখন তিনি এ আবেদন জানাচ্ছিলেন, ঠিক তখনই পাকিস্তানী হানাদার সৈন্যরা সীমান্ত এলাকায় বাঙালি শরণার্থীদের উপর বেধড়ক গুলি চালাচ্ছিল। তাই খান সাহেবের এই আবেদন পাকিস্তানের বেতারকেন্দ্রগুলো থেকে হাম্বা হাম্বা শব্দে রব উঠালেও একজন শরণার্থী ফিরে এল না।

তাই এবারে ‘ছত্রিশা মহাশক্তি জীবন রক্ষক বটিকা’ দিয়েছেন। অর্থাৎ কিনা পাকিস্তানী সেনাবাহিনী, অবাঙালি রাজাকার আর মুসলিম লীগের গুণ্ডা, থুক্কু ভলানিটয়ার দিয়ে অনেক ক’টা Reception Counter খুলেছেন। কি বিচিত্তির এই দেশ সেলুকাস্! বাঙালি শরণার্থীরা ইয়াহিয়া খানের প্রেমে গদগদ হয়ে দেশে ফিরে আসুক আর কি? তারপর বুঝতেই পারছেন এদের অবস্থা। তাই বলেছিলাম, বাংলদেশে একটা কথা আছে— জাতেমাতাল তালে ঠিক – J.M.T.T. সেনাপতি ইয়াহিয়ার এখন সেই অবস্থা।

ভাষায় বাংলাদেশের শরণার্থীদের হানাদার দখলকৃত এলাকায় ডেকে পাঠিয়েছেন। সেকি করুণ আবেদন! বাঙালির দরদে তাঁর দু’চোখ দিয়ে অবিরল ধারায় পানি পড়িয়ে পড়লো। তিনি বাঙালি শরণার্থীদের হানাদার দখলকৃত এলাকায় ফিরে আসার আহ্বান জানালেন। পাকিস্তান সেনাবাহিনী আর এক শ্রেণীর অবাঙালি রাজাকার এসব বাঙালিদের মদত্ করবে।

কিন্তু মদত্ জিনিষটা যে কি, তা বাঙালিরা হাড়ে হাড়ে বুঝতে পেরেছে। তাই সেনাপতি ইয়াহিয়ার কথায় কেউই কান দিলো না। এদিকে লন্ডন টাইম্স পত্রিকা আবার ভাঙা ফুটা করে দিয়েছে। এ পত্রিকায় ২৬শে তারিখের এক খবরে বলা হয়েছে যে, জেনারেল ইয়াহিয়া যখন বাঙালি শরণার্থীদের ফিরে আসার আহ্বান জানাচ্ছেন, ঠিক তখই হানাদার সৈন্যরা সাতক্ষীরা সীমান্তে ঘরবাড়ি ছেড়ে চলে আসা নিরস্ত্র বাঙালি শরণার্থীদের উপর নির্বিচারে গুলি চালাচ্ছে।

ইয়াহিয়া সাহেব জ্ঞানপাপী। যে মুহূর্তে তিনি খবর পেয়েছেন যে বাংলাদেশে ছলে বলে কৌশলে কিছু নির্বাচিত সদস্য জোগাড় করে ক্ষমতা হস্তান্তরের পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারলেই, পশ্চিমা দেশগুলো থেকে আবার সমস্ত রকমের সাহায্য পাওয়া যাবে, সেই মুহূর্তেই তিনি ভোল্ পাল্টে ফেললেন।

গেল ২৬শে মার্চ যে আওয়ামী লীগকে তিনি রাষ্ট্রের শত্রু, দেশের শত্রু আখ্যায়িত করে চৌদ্দ পুরুষের বাপান্ত করে ছেড়েছিলেন; এখন আবার সেই আওয়ামী লীগের মাঝ থেকে কিছু কিছু দেশপ্রেমিক সদস্যদের খুঁজে বের করার হুকুম জারি করে পৌঁ-ধরা নেতাদের ভুলতে বসেছেন। কিন্তু দিন দু’য়েকের মধ্যেই আবার ইসলামাবাদে ঘোরতর দুঃসংবাদ এসে পৌঁছলো। বাংলাদেশের দখলকৃত এলাকা থেকে দালালী করবার মতো জনা আড়াই-এর বেশি নির্বাচিত সদস্য পাওয়া যায়নি।

বাকি সদস্যরা সব একেবারে গায়েব হয়ে গেছে। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশে হানাদার সৈন্যরা এখন মুক্তিফৌজের গেরিলা মাইরের মুখে একেবারে পাগলা হয়ে গেছে। জেনারেল ইয়াহিয়া, তোমাকে একটা কথা বলতে চাই। হা-ডু-ডু খেলা দেখেছো কখনো? সেই হা ডু-ডু খেলায় কেচ্‌কি বলে একটা প্যাচ আছে। বাংলাদেশে তোমার হানাদার বাহিনী এখন সেই কেচ্‌কিতে পড়েছে। আর তুমি বুঝি হেই কেচকির খবর পাইয়া আউ-কাউ কইর‍্যা বেড়াইতাছো। তাই বলেছিলাম- জেনারেল ইয়াহিয়া এখন ঝিম্ ধরেছেন।

চরমপত্র, ৩০ মে ১৯৭১ :

বাংলাদেশের দখলকৃত এলাকায় আজকাল একটা শব্দের বড্ড বেশি চল্ হয়েছে। শব্দটা হচ্ছে ‘প্রাক্তন’- ইংরেজিতে যাকে বলে Ex কিংবা Former। জেনারেল ইয়াহিয়া খানের হানাদার বাহিনী এসব Former-ওয়ালাদের সংগেই খুব বেশি রকম দহরম-মহরম চালাচ্ছেন। আজকে এসব Former লোকদের কিছু পরিচয় দিতে চাই। অবশ্য এঁদের Informer-ও বলতে পারেন। কেননা দালালীর সংগে সংগে চোকলামি মার্কা খবর সংগ্রহও এদের মস্ত বড় যোগ্যতা।

এদের পরিচয় দিতে যেয়ে কার নাম যে প্রথমে বলবো, সেটাই ভেবে পাচ্ছি না। কেননা এসে এক বড়া। কাকে রেখে কার কথা বলি? যাক্ প্রথমে শুকুয্যাকে দিয়েই শুরু করা যাক। হায় আল্লাহ, শুকুয্যাকে চেনেন না। আঁরার চাঁটগার শুক্কুয্যা। হ-অ-অ বুঝছি ফ কা কইলে চিনতে পারবেন। যিনিই শুক্কুয্যা তিনিই ফা কা- অর্থাৎ কিনা চট্টগ্রামের ফজলুল কাদের চৌধুরী। এই চৌধুরী সাহেব আইয়ুব খানের আমলে পাকিস্তানের পার্লামেন্টে একবার স্পিকার হয়েছিলেন।

ব্যাস্ আর যায় কোথায়! সারা জীবনের মতো প্যাডের মাণ্ডুলে নিজের নামের পাশে Former Speaker, Pakistan Parliament কথা ক’টা ছাপিয়ে ফেললেন। এবারের সাধারণ নির্বাচনের প্রাক্কালে জনৈক সাংবাদিক তাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন ‘স্যার আপনার Election Prospect টা কি রকম? অমনি বিকট এক অট্টহাসিতে ফেটে পড়লেন। গলাটা একটু নিচু করে বললেন, ‘আমার Result খারাপ হলে তো Riot শুরু হয়ে যাবে।

আমাদের ফ কা চৌধুরীর যেরকম দশাসই চেহারা, তেমনি মোটাবুদ্ধি। তাই Election-এর সময় উনি তাঁর এলাকার Minority ভোটারদের পরিষ্কার ভাষায় বলে দিলেন, ‘আমি হেরে গেলে কিন্তু আপনাদের ঘরবাড়ি ছাড়তে হবে, সে বুঝে ভোট দিবেন।’ এদিকে নির্বাচনের ডামাডোলে শেখ মুজিবুরের পক্ষেও আর চট্টগ্রামের গ্রামাঞ্চল সফর করা সম্ভব হলো না। তাই সব্বাই ভেবেছিলেন অন্ততঃ কনভেনশন মুসলিম লীগের প্রেসিডেন্ট জনাব ফ কা চৌধুরী এবারে নির্বাচনে জিতবেনই।

কিন্তু আওয়ামী লীগ প্রার্থী অধ্যাপক মোঃ খালেদ এহেন ফ কা চৌধুরীকে Election-এ ল্যাং মেরে দিলেন। তাই চৌধুরী সাহেব সেই Former Speaker-ই থেকে গেলেন। Current হওয়া আর তার কপালে জুটলো না। পাকিস্তানের হানাদার বাহিনী যে চট্টগ্রাম থেকে এধরনের একজন পরাজিত নেতাকে দলে ভিড়াতে পারবেন, তা একেবারে সুনিশ্চিত ছিল। ইনি এখন খালি মাঠে গদা ঘুরিয়ে বেড়াচ্ছেন। আর চোখে মুখে ইসলামের ভুল ব্যাখ্যা করছেন।

দু’নম্বরে যাঁর কথা বলবো তিনি নিজেই এক ইতিহাস। লোক চক্ষুর অন্তরালে তিনি পাকিস্তানের ষড়যন্ত্র রাজনীতির সংগে সংশ্লিষ্ট রয়েছেন। জীবনে কোনো দিন কোনো প্রত্যক্ষ নির্বাচনে ইনি জয়লাভ করতে পারেননি। তাই নির্বাচন জিনিষটাকে ইনি বরাবরই পছন্দ করেননি। আর বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ সম্পর্কে এঁর বেশ এলার্জি আছে। এঁর অদ্ভুত চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যও রয়েছে। গরমের সময় একদিন তিনি অফিসে বসে তাঁর পিওনকে একটা ডাব আনতে বললেন। কাচের গ্লাসে সেই ডাবের পানি খেলেন।

খালি গ্লাসটা তখনও তাঁর টেবিলের উপর পড়ে রয়েছে। কিন্তু গ্লাসটার তলায় সামান্য একটু ডাবের তলানী পানি ছিল। এমন সময় পিওনটা এসে খালি গ্লাসটা নিয়ে গেল। মিনিট দু’য়েক পরেই সাহেব গর্জন করে উঠলেন। দৌড়ে পিওন ঘরে প্রবেশ করলো। সাহেব হুংকার দিয়ে বললেন, ‘অর্ধেক গ্লাস ডাবের পানি কি হলো?’ পিওনের চোখ কপালে উঠলো। বেচারা শুধু আমৃতা আমৃতা করে হাত দু’টো কচলাতে লাগলো। সাহেবের হুকুম হলো, ওসব বুঝি না, আমার ডাবের পানি আইন্যা দাও।’

পিওন মুখ কাচুমাচু করে বেরিয়ে যেয়ে নিজের গ্যাটের পয়সা খরচ করে ডাব কিনে এনে পরিবেশন করলো। আর ভদ্রলোক বেশ আরামসে সেই ডাবের পানি খেলেন। হায় খোদা! এখনও একে চিনতে পারলেন না। ইনিই হচ্ছেন পাকিস্তানের প্রাক্তন ফরিন মিনিষ্টার জনাব হরিবল হক- না, না, না জনাব হামিদুল হক চৌধুরী।

এঁরই পরামর্শে তো’ এবার ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের বস্তি এলাকাগুলো হানাদার সৈন্যরা জ্বালিয়ে পুড়িয়ে খাক্ করে দিয়েছে আর হত্যার তাণ্ডব লীলা চালিয়েছে। এই হামিদুল হক চৌধুরীই তো ঢাকার পাকিস্তান অবজার্ভার, পূর্বদেশ আর উর্দু দৈনিক ওয়াতান ছাড়াও উর্দু এবং বাংলা সাপ্তাহিক চিত্রালির মালিক।

মে মাসের গোড়ার দিকে হঠাৎ করে একদিন দুপুরে দেখা গেল একটা লাল রঙের গাড়িতে চৌধুরী সাহেব নারায়ণগঞ্জের নবীগঞ্জে ঘুরে গেলেন। সে রাতেই নবীগঞ্জের আকাশ আগুনের লেলিহান শিখায় লাল হয়ে উঠলো। পাকিস্তানের হানাদার বাহিনীর আক্রমণে নবীগঞ্জের শত শত সুখের সংসার লণ্ডভণ্ড হয়ে গেল।

জনাব চৌধুরী করিৎকর্মা লোক। তাই নিজের আইন ব্যবসা আর খবরের কাগজের ব্যবসা ছাড়াও ছাপাখানা, প্যাকেজেস ইন্ডাস্ট্রিজ, চা বাগান মায় চিটাগাং রিফাইনারির জন্য আমদানীর বিরাট ইম্‌পোর্ট লাইসেন্স পর্যন্ত রয়েছে। আর এদিকে কবে গাওয়া ঘি দিয়ে ভাত খেয়েছিলেন- সে ঘি-এর গন্ধের কথা তিনি এখনো বড় গলায় বলে বেড়াচ্ছেন।

তিনি হচ্ছেন পাকিস্তানের প্রাক্তন ফরিন মিনিস্টার। আর এই ফরিন মিনিস্টার থাকার সময়েই তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরলোকগত পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন ফস্টার ডালেসের সংগে সিয়াটো চুক্তিতে দস্তখত করেছিলেন। এছাড়া সুয়েজ খাল সংকটের সময় পাকিস্তানের এই ফরিন মিনিস্টারই সংযুক্ত আরব প্রজাতন্ত্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট নাসেরকে বিরাট ধাপ্পা দিয়েছিলেন। এ ধাপ্পাবাজী ধরা পড়লে বহু বছর পর্যন্ত পি.আই.এ. বিমানের কায়রো বিমানবন্দরে অবতরণ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।

এ্যাই-ই যাঃ জনাব চৌধুরীর সবচেয়ে বড় যোগ্যতার কথাটাই তো বলা হয়নি। ভারত বিভাগ হওয়ার পর পূর্ব বাংলায় মুসলিম লীগ সরকারের ইনি কিছুদিন অর্থমন্ত্রী ছিলেন। সে এক ভয়াবহ ব্যাপার। পুকুর চুরি চেনেন! দিনে দুপুরে সেই পুকুর চুরি শুরু হলো। শেষ পর্যন্ত এ্যালেন বেরির ড্রাম চুরির ব্যাপারে ভদ্রলোক অক্করে হাতে-নাতে ধরা পড়ে গেলেন।

এই বিদিকিছছি ব্যাপারের ঠ্যালাতেই ভদ্রলোকের অবস্থা একেবারে কেরাসিন হয়ে উঠলো। হামিদুল হক চৌধুরীর অবস্থা একেবারে ছেরাবেরা হয়ে গেল। এখন নোয়াখালীর এহেনো হরিবল হক চৌধুরী আর চাটিগার ফ.কা. চৌধুরীর মতো Former লোকেরাই পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর স্যাংগাৎ হয়েছেন। চোরের সাক্ষী গাঁট কাটা আর কি? কিন্তু আর কতদিন? বয়স তো হলো। বারে বারে ঘুঘু তুমি খেয়ে যাও ধান এইবারে ঘুঘু তোমার বধিব পরাণ’।

চরমপত্র, ৩১ মে ১৯৭১ :

মাস ছয়েক আগেকার কথা। বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের উপর দিয়ে তখন এক ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় আর সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস হয়ে গেছে। সে এক ভয়ংকর দৃশ্য। মানব সভ্যতার ইতিহাসে এরকম প্রাকৃতিক ধ্বংসলীলা আর হয়নি বললেই চলে। এই ঘূর্ণিঝড়ে বাংলাদেশের আট হাজার বর্গমাইল এলাকার প্রায় দশ লাখ লোক নিহত আর প্রায় ত্রিশ লাখ লোক গৃহহারা হয়েছিল।

তাই বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদী নেতা থেকে শুরু করে সংবাদপত্রগুলো পর্যন্ত সাহায্যের জন্যে করুণ আবেদন করলেন। একমাত্র পশ্চিম পাকিস্তান ছাড়া বিশ্বের সমস্ত সভ্যদেশ থেকে সাহায্য ও রিলিফ দ্রব্য এসে পৌঁছাতে শুরু করলো। শেষ পর্যন্ত বৃটিশ সরকার দুর্গম দ্বীপাঞ্চলের গলিত লাশ দাফন আর রিলিফের কাজের জন্য সিঙ্গাপুর থেকে দুই জাহাজ ভর্তি সৈন্য পাঠালো।

অমনি ইসলামাবাদের জঙ্গি সরকারের টনক নড়লো। কয়েক কোম্পানি পাক সৈন্যকে দ্রুত ঘূর্ণিবিধ্বস্ত এলাকায় হাজির হওয়ার নির্দেশ এল। দুটো উদ্দেশ্য; এক নম্বর হচ্ছে- বৃটিশ সৈন্যদের কাজকর্মের উপর কড়া নজর রাখা। আর দু’নম্বর বিশ্বকে বোঝানো যে, পাকিস্তানী সৈন্যরাও রিলিফ কাজে লেগে পড়েছে। এধরণের পাকিস্তানী এক কোম্পানি সৈন্যের সংগে ঘূর্ণিঝড়ের দিন দশেক পর নোয়াখালীর চর বাটায় দেখা হলো। তখন বেলা প্রায় চারটা বাজে।

সমস্ত ভৌতিক এলাকাটার উপর বিকেলের পড়ন্ত রোদ এসে পড়েছে। শ’দুয়েক গজ দুরে কিছু ছাত্র আর স্বেচ্ছাসেবকের দল একটা ভেঙ্গে যাওয়া মসজিদ মেরামত করছে। হঠাৎ করে লক্ষ্য করলাম সৈন্যদের মধ্যে খানিকটা চাঞ্চল্য দেখা দিয়েছে। কোম্পানির কমান্ডার এগিয়ে যেয়ে ছাত্র আর স্বেচ্ছাসেবকদের একটু দূরে সরে যেতে বললেন আর নিজের সৈন্যদের মসজিদ মেরামতের কাজে হাত লাগাবার নির্দেশ দিলেন।

দেখে মনটা খুশিতে ভরে উঠলো। একটু ভালো করে লক্ষ্য করে দেখলাম আর্মির একজন ফটোগ্রাফার দৌড়ে যেয়ে সৈন্যদের মসজিদ মেরামতের বেশ কয়েকটা ছবি তুললো। এখানেই ঘটনার ইতি হয়ে গেল।

মিনিট পনেরোর মধ্যেই সৈন্যরা হাত ধুয়ে নোয়াখালীর দিকে ডবল মার্চ করে ফিরে চললো। আর কমাণ্ডার সাহেব ছাত্র আর স্বেচ্ছাসেবকদের আবার তাদের কাজে হাত দেয়ার নির্দেশ দিলো। দিন দু’য়েকের মধ্যেই এসব ফটো ঢাকা, করাচী, লাহোর আর পিন্ডির সমস্ত কাগজে ফলাও করে ছাপা হলো। পাকিস্তানী সৈন্যরা নাকে কর্পূরের পোটলা বেঁধে কি সোন্দর ভাবে রিলিফের কাজ করছে। এটাই হচ্ছে পাকিস্তানীদের Propaganda লাইনের একটা ধারা।

এধরনের Propaganda চালাবার জন্য ইসলমাবাদ কর্তৃপক্ষের যতগুলো মাধ্যম রয়েছে, তার মধ্যে A.P.P. সংবাদ সংস্থা অন্যতম। পশ্চিম পাকিস্তান সরকার বছরে এই সংবাদ সরবরাহ সংস্থাকে বারো লাখ টাকা সাহায্য দিচ্ছে। এর একমাত্র কাজই হচ্ছে সরকারের সমস্ত মিথ্যা প্রচারণাগুলেকে সাজিয়ে গুছিয়ে টেলিপ্রিন্টরের মাধ্যমে খবরের কাগজ আর রেডিও অফিসে পৌঁছে দেয়া।

তাই ২৫শে মার্চ থেকে দু’মাস ধরে অবিরামভাবে এই A.P.P. একটা খবরই দিয়ে চলেছে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে গেছে। ঢাকা এবং প্রদেশের সর্বত্র দোকান-পাট অফিস-আদালত চালু হয়েছে।

আর অমনি ঢাকার দখলকৃত বেতারকেন্দ্র থেকে তারস্বরে চিৎকার শুরু হয়ে গেল ‘পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে গেছে দোকানপাট সব খুলে গেছে। হ্যাঁ ঢাকার দোকানপাট সবই খোলা রয়েছে। নবাবপুর ইসলামপুর রোড দিয়ে হেঁটে গেলেই তো তা বোঝা যায়। কেননা এসব এলাকার সমস্ত দোকানগুলো হয় ছাই হয়ে গেছে, না হয় খোলা রয়েছে।

দোকানগুলোর দরজা নেই কিনা? তাই দূর থেকে খোলাই মনে হয়। দোকানের দরজাগুলো ভেঙ্গে লুট করাতেই দোকানগুলো এখন হা-করে খুলে আছে। তা দেখেই আমী পি.আর.ও মেজর সিদ্দিক সালেক ঢাকার পুরানা পল্টনের A.P.P. অফিসের দোতলায় বসে নিউজ দিচ্ছেন- পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে গেছে।

আর ঢাকার দু’হাজার সার্কুলেশনওয়ালা কাগজগুলো বগল বাজিয়ে সেই সব সংবাদ আজও পর্যন্ত পরিবেশন করে বেড়াচ্ছে। প্রতিদিন সকালে আবার মেজর সিদ্দিকের মতো লোকেরাই ছাপার অক্ষরে সে সংবাদ পড়ে খুশিতে গদগদ হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আহম্মক আর কাকে বলে।

এর সঙ্গে আবার জুটেছে হারু মিয়ার দল। হারু মিয়াদের চিনলেন না? এবারের নির্বাচনে বাঙালিদের জ্বালায় যারা হেরে গেছেন তাদেরই Shortcut-এ ‘হারু’ মিয়া বলা হয়। হানাদার দখলকৃত এলাকায় এসব হারু মিয়ার দল এখন দারুণ active হয়েছে। সামরিক প্রহরায় কোনো বাড়ির মধ্যে একদল অবাঙ্গালির সংগে বেঠক করেই এঁরা মেজর সিদ্দিকের কাছে দৌড়াচ্ছেন। আর অমনি সিদ্দিক সাহেব A.P.P-র মাধ্যমে সে সংবাদ জায়গা মতো পৌঁছে দিচ্ছেন।

অবশ্য কয়েকটা লাইন সেখানে এই বলে জুড়ে দেয়া হচ্ছে যে, বিরাট জনসভা আর জনসাধারণের স্বতঃস্ফূর্ত সহযোগিতা। এবারের সাধারণ নির্বাচনের সময়েও এই হারু মিয়ার দল হাজারে হাজার বিরাট জলসা করেছিলেন আর জনসাধারণের স্বতঃস্ফূর্ত সহযোগিতা পেয়েছিলেন।

খালি ইলেকশনের result টা out হওয়ার পর জানতে পারলেন যে, তারা লাড্ডু পেয়েছেন। সমস্ত বাঙালিরা দেশের শত্রু হওয়াতেই তাদের এই কুফা অবস্থা। তাই তো এখন এই হারু মিয়ার দল নিরস্ত্র আর নিরীহ বাঙালির উপর প্রতিশোধ নেয়ার কাজে নেমেছে। কিন্তু হ্যালো, হারু মিয়ার দল একটা কথা কাইয়্যা রাখি- ওস্তাদের মাইর কিন্তু বিয়্যান রাইতে। হপায় তো খেলার শুরু!

আরও পড়ুন :