চরম উষ্ণতা প্রভাব ফেলছে মানব আচরণে

চরম উষ্ণতা হচ্ছে উষ্ণতার সেই পরিমাপ যা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা ৯৫ ডিগ্রি ফারেনহাইটের বেশি উষ্ণতাকে বোঝায়। মানবদেহ চরম উষ্ণতা সামলে সঠিক কাজ চালিয়ে যেতে পারে না। সম্প্রতি চরম উষ্ণতায় শীর্ষতালিকায় আমাদের প্রাণের শহর ঢাকার নাম উঠে এসেছে। বর্তমানে এই শহরের কর্মক্ষমতা অনকে কমে গেছে।

তাপমাত্রা উদ্ধগতি মানবদেহের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে থাকে। তখন মানুষের বিভিন্ন কাজের পারফরম্যান্স ও সামগ্রিকভাবে তাদের কোপিং মেকানিজম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিশেষজ্ঞরা চরম উষ্ণতায় মানুষের আচরণগত আগ্রাসন বৃদ্ধি, কর্মক্ষমতা হ্রাসের সম্পর্ক খুঁজে পেয়েছেন।

বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি

বৈশ্বিক উষ্ণতা Copyright Free Image by pixabay.com-g540d1d358_1920
বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে দিন দিন

বৈশ্বিক তাপমাত্রা ক্রমাগত ঊর্ধ্বমুখী হচ্ছে। ঠিক তেমনি বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তকে হিটওয়েভ সেদ্ধ করে তুলছে আর অতীতের সব রেকর্ড-ভাঙছে। এই সময় চরম উষ্ণতা মানব আচরণের উপর ভবিষ্যতে খুব খারাপপ্রভাব ফেলতে চলেছে। বিষয়টি বার বার সতর্ক করে দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

মানবদেহের সবচেয়ে ক্ষতি করে হিটস্ট্রোক। হিটস্ট্রোকের  শিকার অনেক ব্যক্তিই মাত্র  ৪০ ডিগ্রী সেলসিয়াস  বা ১০৪ ডিগ্রী ফারেনহাইট অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রায় প্রাণ হারিয়েছেন। 

হিটস্ট্রোকের শিকার ব্যক্তির দেহের প্রসারিত নালীতে রক্ত সঞ্চালন পূর্ণ রাখতে হৃৎপিণ্ড ও ফুসফুস প্রচণ্ড পরিশ্রম করে। এক পর্যায়ে হৃৎপিণ্ডের পক্ষে আর কুলিয়ে ওঠা সম্ভব হয় না। তখন রক্তচাপ কমে যায়, ফলে ওই ব্যক্তি মাথা ঝিমঝিম করা, অবসন্নতা, চলাচলে তাল হারিয়ে পড়ে যাওয়া এবং কথা জড়িয়ে যাওয়ার মতো প্রতিক্রিয়ার শিকার হন। শরীরে লবণের অভাব দেখা দেয় ও মাংসপেশি সংকুচিত হয়। এই সংকটপূর্ণ অবস্থায় অধিকাংশ মানুষ বুঝতেই পারেন না যে তাদের জরুরি সাহায্য দরকার।

বিশেষত স্বল্প-আয়ের জনগোষ্ঠী ও দেশসমূহ এর ভুক্তভূগী। যাদের কাছে অতিরিক্ত তাপমাত্রা মোকাবেলার কোন পদ্ধতি নেই। পর্যাপ্ত সুয়োগ সুবিধা না থাকায় তারা এক্ষেত্রে সামনের সারির ভুক্তভোগী।

চরম উষ্ণতা ও আগ্রাসন

চরম উষ্ণতার মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব মানব আচারণকে বৈষম্যমূলক ও অসম করে তুলছে। বিজ্ঞানীরা বিগত এক শতকেরও বেশি সময় ধরে উপত্য সংগ্রহ করে যাচ্ছেন। যে চরম উষ্ণতায় মানবজাতিকে কোন কোন ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। এই জন্য বিজ্ঞানীরা উচ্চমাত্রায় নিয়ন্ত্রিত ল্যাব সেটিংসের মাধ্যমে পর্যলোচনা করেছে। 

সামাজিক মনস্তত্ত্ববিদ ক্রেইগ অ্যান্ডারসন ও সহকর্মীরা আন্ডারগ্র্যাজুয়েট শিক্ষার্থীদের উপর পরীক্ষা চালায়। তাদের দেওয়া হয়েছিল এক দম্পতির মধ্যকার কথোপকথনের চারটি ভিডিও ক্লিপ। একটি ক্লিপের টোন বেশ নিরপেক্ষই ছিল। কিন্তু বাকি তিনটি ক্লিপে দেখানো হয়েছিল কীভাবে ওই দম্পতির মধ্যে কলোহল বাড়তে থাকে।

শিক্ষার্থীরা প্রত্যেকেই যে রুমে বসে ছিল সেখানকার থার্মোস্ট্যাটে পাঁচটি ভিন্ন ধরনের তাপমাত্রা সেট করা ছিল। সেই বিভিন্নতা শুরু হয়েছিল সর্বনিম্ন ১৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস উষ্ণতা পর্যন্ত।

আরও দেখুন:

গবেষকরা শিক্ষার্থীদেরকে দম্পতিটির পারস্পরিক বৈরীভাবের মাত্রাকে স্কোরিং করতে বলেন। সেই স্কোরিং থেকে অ্যান্ডারসন লক্ষ্য করেন।

যে শিক্ষার্থীরা উষ্ণ রুমে বসে ছিল, ভিডিওটিকেও তুলনামূলক বেশি বৈরীভাবসম্পন্ন ক্লিপ হিসেবে রায় দিয়েছে। 

কিন্তু যে শিক্ষার্থীরা শীতল রুমে আরামে বসে ছিল, তারা সঠিক সিদ্ধান্ত দিয়েছেন।

এই গবেষণার পরিপ্রেক্ষিত অ্যান্ডারসন সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যে, উষ্ণতা মানুষের মেজাজকে অপেক্ষাকৃত বেশি খিটখিটে করে তোলে। অ্যান্ডারসনের এই সিদ্ধান্ত ও ফলাফল প্রকাশিত হয় ২০০০ সালের অ্যাডভান্সেস ইন এক্সপেরিমেন্টাল সোশ্যাল সাইকোলজিতে।

উষ্ণতা ও পারফরম্যান্স

চরম উষ্ণতা কর্মক্ষেত্রে মানুষের পারফরমেন্সের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। শিল্প কারখানাগুলোতে পর্যালোচনা করে দেখা যায় যে। যেসব দিনে তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের উপর উঠে যায়, সেসব দিনে কারখানায় প্রাত্যহিক উৎপাদন হ্রাস পায়। ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কম তাপমাত্রার দিনগুলোর চেয়ে প্রায় ২ শতাংশ কমে যায়। অপরদিকে গার্মেন্টসে সেলাইয়ের হার কমে যায় ৮ শতাংশ পর্যন্ত। অতিরিক্ত উষ্ণতা অনেক দেশের অর্থনীতিকে একটু একটু করে ধসিয়ে দেয়।

উষ্ণতা প্রশমনের উপায়

চরম উষ্ণতা বৃদ্ধির বোঝা অধিকাংশ সময়ই বইতে হয় একটি দেশের দরিদ্রতম জনগোষ্ঠীকে। যেমন- গত ১৪ জুলাইয়ের ক্লাইমেট সেন্ট্রালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের বৈষম্যমূলক আবাসান নীতিমালার ফলস্বরূপ, সবচেয়ে দরিদ্র মানুষগুলোকেই বাস করতে হয় একটি শহরের উষ্ণতম অঞ্চলে।

জলবায়ু পরিবর্তন Copyright Free Image by pixabay.com-g9a026b2af_1280
জলবায়ু পরিবর্তন হচ্ছে প্রাণহীন হচ্ছে পৃথিবী

একটি শহরের ওই উষ্ণতম অঞ্চলগুলোকে বলা হয়ে থাকে ‘আর্বান হিট আইল্যান্ডস’, যেখানে প্রত্যহ দুপুরের মাঝামাঝি তাপমাত্রা বেড়ে যেতে পারে অন্যান্য এলাকার চেয়ে ৮ থেকে ১১ ডিগ্রি সেলসিয়াস। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর বসতি যেখানে, সেখানে এর ফলাফল দাঁড়ায় সবচেয়ে খারাপ, কেননা সেখানে জনসংখ্যার ঘনত্ব হয়ে থাকে অনেক বেশি, সবুজের পরিমাণ থাকে নিতান্তই কম, এবং ওসব জায়গার পৃষ্ঠতল প্রতিফলনের বদলে তুলনামূলক বেশি সূর্যরশ্মি শুষে নেয়।

প্রথম শিল্প বিপ্লবের পর থেকে উন্নত দেশের জলবায়ুর প্রতি উদাসীনতার কারণে। আজ আর সহজে গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না। এদিকে চট করেই তাপ কমার আশাও করা যাচ্ছে না। এই মুহূর্তে নিঃসরণ কমালেও আগামী কয়েক দশক জুড়েই পৃথিবীর উষ্ণতা বাড়বে। পরিবর্তনের এই ধারা পৃথিবীতে জীবন ও জীবন ধারণের সব সংজ্ঞা কেউ বদলাতে চলেছে।

চরম উষ্ণতা কমাতে আমাদের এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে। জীবাশ্ম জ্বালানীর পরিবর্তে আমাদেরকে সোলার প্যানেল ও ওয়াণ্ডমিলের ব্যবস্থা করতে হবে।

প্লাস্টিকের পরিবর্তে পাট ও রিউইজেবেল পণ্য ব্যবহার করতে হবে। এতে করে প্রাকৃতিতে প্লাস্টিক আর জমা হবে না। অতীতে ব্যবহৃত প্লাস্টিক সংগ্রহ করে অন্যান্য পণ্য তৈরিতে ব্যবহার করতে হবে। যাতে করে প্রকৃতি তার আগের রূপ ফিরে পায়। বেশি বেশি গাছপালা লাগাতে হবে প্রতিটা বাড়িতে গাছ লাগাতে হবে।

বৈশ্বিক উষ্ণতা রোধে বড় বড় দেশগুলোকে পরিবেশ দূষন বন্ধ করতে হবে। এবং টেকসয় উন্নয়নের লক্ষ্যে এক হয়ে কাজ করতে হবে।

চরম উষ্ণতা সম্পর্কে আরও জানতে:

বাংলাদেশের খবর সাইটটি ব্যবহার করায় আপনাকে ধন্যবাদ। আমাদের সাথে যোগাযোগ করতে চাইলে “যোগাযোগ” আর্টিকেলটি দেখুন, যোগাযোগের বিস্তারিত দেয়া আছে।