আর্যদের ভারত জয়ের কাহিনী : রামায়ণ – ড: এম আর দেবনাথ

রামায়ণ : ভারতীয় দুই কালজয়ী মহাকাব্যের একটি হচ্ছে রামায়ণ এবং অন্যটি মহাভারত। । যুগ যুগ ধরে রামায়ণ ও মহাভারত অগণিত মানুষের কাছে সমাদৃত হয়ে আসছে। অনেকেই এ দুটো মহাকাব্যকে ধর্মগ্রন্থ হিসেবে গণ্য করেন। তাদের কাছে বেদ নয় রামায়ণ ও মহাভারতই ধর্মগ্রন্থ। মানুষ ধর্মীয় প্রশ্নের উত্তরে এ দুটো গ্রন্থকেই দিক নির্দেশনা হিসেবে গ্রহণ করে।

রামায়ণ ও মহাভারতের আদর্শবাদ, কাহিনীর নিপুণ বিন্যাস ও সুললিত ছন্দ যে কোনো পাঠককে স্পর্শ করে। রামায়ণকে দেখা হয় গৃহধর্মের আকর গ্রন্থ হিসেবে। রামায়ণে বিধৃত পিতৃভক্তি, মাতৃভক্তি, ভ্রাতৃভক্তি, সীতার দুঃখময় জীবন, রামভক্তি, হনুমানের বীরত্ব, রাবণ ও মেঘনাদের বীরত্ব, রাবণের অহঙ্কার, সীতার অগ্নিপরীক্ষা, বিভীষণের ভূমিকা, বালী বধ ও শব্দুক বধ ইত্যাদি ঘটনা আজও মানুষের মুখে মুখে।

পণ্ডিতদের দৃষ্টিতে রামায়ণ হচ্ছে বহিরাগত আর্যদের ভারত জয়ের কাহিনী। এ বিজয় যতটা না বীরত্বের মাধ্যমে তার চেয়ে বেশি স্থানীয় কিছু মানুষের সহযোগিতায় যাদের বানর, হনুমান ইত্যাদি বলে চিত্রিত করা হয়। যারা রামায়ণকে আর্যদের বিজয় ইতিহাস বলে মনে করেন তাদের মতে মহাভারত হচ্ছে আর্যদের নিজেদের মধ্যেকার জ্ঞাতিযুদ্ধ ।

উল্লেখ্য রামায়ণ ও মহাভারতের মধ্যে রামায়ণই অধিকতর জনপ্রিয় এবং প্রকৃতপক্ষে এটিই ভারতের জাতীয় মহাকাব্য। ভারতীয় সভ্যতার কেন্দ্রবিন্দুতে রামায়ণ, মহাভারত নয়। নিচে রামায়ণের সংক্ষিপ্ত একটি পরিচয় তুলে ধরা হল:

১. রামায়ণের রচয়িতা:

মহর্ষি বাল্মীকি রামায়ণের রচয়িতা বলে পরিচিত। তাঁর প্রকৃত নাম রত্মাকর। পেশায় ডাকসাইটে দস্যু। জীবনের এক পর্যায়ে তিনি ঋষিতে উন্নীত হন। বিশ্বাস করা হয় তিনি নারদের কাছ থেকে রামের বৃত্তান্ত শুনেন। ব্রহ্মার নির্দেশে বাল্মীকি সংস্কৃত ভাষায় রামায়ণ রচনা করেন। ব্রহ্মার বরেই তিনি কবিত্ব লাভ করেন। বিশ্বাস করা হয় শরবিদ্ধ পাখিকে দেখে নিজের অজান্তেই বাল্মীকির মুখ থেকে বেরিয়ে আসে বিশ্বসাহিত্যের প্রথম শ্লোক বা কবিতা। বাংলাভাষীদের কাছে কৃত্তিবাস ওঝার বাংলা রামায়ণ জনপ্রিয়।

মুষ্কিল হচ্ছে অনুবাদের সময় তিনি নিজে বেশ কিছু সংযোজন করেন। যেমন রামের দুর্গোৎসবের প্রসঙ্গ। এটি মূল বাল্মীকি রামায়ণে নেই। কিন্তু কৃত্তিবাসী বাংলা রামায়ণে আছে। এদিকে তুলসীদাসের রামচরিতমানসের (বাংলা রামায়ণ) সঙ্গেও বাল্মীকি রামায়ণের বেশ কিছু গড়মিল আছে। এ সূত্রেই প্রশ্ন ওঠে বাংলা রামায়ণে যদি এমন সংযোজন হয়ে থাকে তাহলে বাল্মীকির নামে চালু রামায়ণে যে এ ঘটনা ঘটে নি তার নিশ্চয়তা কি? বিশেষ করে যখন এ মহাকাব্যটি কয়েক শো বছর ধরে রচিত হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে বলা দরকার বিভিন্ন অঞ্চলে ও বিভিন্ন দেশে নানা রকমের রামায়ণ আছে। এসবের মধ্যে অনেক বড় বড় গড়মিলও লক্ষণীয়। এমতাবস্থায় এ কথা বলা কঠিন মূল রামায়ণ কতটুকু, আর কতটুকু অন্যান্যদের সংযোজন বা প্রক্ষিপ্ত। অনেকের মতে রামায়ণের উত্তরকাণ্ড মূল রামায়ণে নেই। বাল্মীকি রাম-সীতাকে অযোধ্যায় ফিরিয়ে এনে রামকে সিংহাসনে বসিয়েই রামায়ণ শেষ করেন। তিনি সীতাকে নির্বাসনে পাঠান নি।

২. রামায়ণের রচনাকাল:

ড. সুকুমারী ভট্টাচার্যের মতে প্রাচীন ভারত সমাজ ও সাহিত্য: আনন্দ পাবলিশার্স প্রা: লি: কলকাতা) রামায়ণ খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় বা দ্বিতীয় থেকে খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় বা তৃতীয় শতকের মধ্যে রচিত হয়। এদিকে মহাভারত রচনা শুরু হয় খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম বা চতুর্থ শতকে এবং রচনা শেষ হয় খ্রিস্টীয় চতুর্থ বা পঞ্চম শতকে। অর্থাৎ রামায়ণ পরে শুরু হয়ে আগে শেষ হয় এবং মহাভারত আগে শুরু হয়ে পরে শেষ হয়। এ জন্যই রামায়ণকে আদি মহাকাব্য বলা হয়। এখানে উল্লেখ্য দুটোরই রচনাকাল বুদ্ধের-পরবর্তী কাল।

৩. রামায়ণের আকার:

রামায়ণে ৪০,০০০ এরও বেশি শ্লোক আছে। এ শ্লোকগুলো সপ্তকাণ্ডে বিন্যাস করা যেজন্য বলা হয় সপ্তকাণ্ড রামায়ণ রামায়ণের কলেবর মহাভারতের এক-চতুর্থাংশ। মূল বাল্মীকি রামায়ণে অবশ্য ২৪০০০ শোক আছে।

৪. রামায়ণের সংক্ষিপ্ত কাহিনী:

রামায়ণ কাহিনীর সংক্ষিপ্ত ও একটি সুন্দর বর্ণনা দেওয়া আছে বিষ্ণুপদ চক্রবর্তীর গ্রন্থে (রামায়ণ আনন্দ পাবলিশার্স প্রা: লি: কলকাতা, ১৯৯৮)। চক্রবর্তীর ভাষায় বিভিন্ন কাণ্ডে সাজানো বর্ণনাটি হুবহু নিম্নরূপ:

ক. বালকাণ্ড:

অযোধ্যার ইক্ষাকু বংশীয় রাজা দশরথের তিন রানি। কৌশল্যা, কৈকেয়ী আর সুমিত্রা। কোনও ছেলে নেই। পুত্রেষ্টি যজ্ঞ করলেন দশরথ। চার ছেলে হল। কৌশল্যার গর্ভে রাম, কৈকেয়ীর গর্ভে ভরত, আর সুমিত্রার গর্ভে দুই যমজ ছেলে, লক্ষ্মণ আর শত্রুঘ্নের জন্ম হল।

রাক্ষস মারীচ আর সুবাহুকে বধ করার জন্য রামকে নিয়ে যেতে, দশরথের রাজসভায় এলেন ব্রহ্মর্ষি বিশ্বামিত্র। অনিচ্ছাসত্ত্বেও, বৈশিষ্ঠের পরামর্শে, সম্মতি দিলেন দশরথ। রাম-লক্ষ্মণকে নিয়ে চললেন বিশ্বামিত্র। পথে ভয়ঙ্কর তাড়কা রাক্ষসীকে বধ করলেন রাম। বিশ্বামিত্রের আশ্রমে যজ্ঞে বাধা দিতে এসে, রামের বাণে ধরাশায়ী হলেন সুবাহু। মারীচ গিয়ে পড়লেন এক শো যোজন দূরের সমুদ্রে। মিথিলায় ঢুকেই, গৌতম মুনির আশ্রমে শাপগ্রস্তা পাষাণী অহল্যাকে শাপমুক্ত করলেন রাম।

মিথিলার রাজা জনকের পালিতা মেয়ে সীতা জনক ঘোষণা করলেন, যে ‘হরধনু’ তে শর জুড়তে পারবে, তার গলায় সীতা মালা দেবে। রাম ভাঙলেন সেই হরধনু। রামের গলায় মালা দিলেন সীতা জনকের নিজের মেয়ে ঊর্মিলার সঙ্গে বিয়ে হল লক্ষ্মণের। জনকের ভাই কুশধ্বজের দুই মেয়ে মাণ্ডবী আর শ্রুতকীর্তি মালা দিলেন যথাক্রমে ভরত আর শত্রুঘ্নের গলায় পরশুরামের দর্প ছিল, তাঁর ‘বিষ্ণুধনু’তে কেউ জ্যা আরোপ করতে পারবে না। সে দর্প চূর্ণ করলেন রাম। সবাই মিলে ফিরে এলেন অযোধ্যায় রাম অযোধ্যার সবার নয়নের মণি হয়ে উঠলেন।

খ. অযোধ্যাকাণ্ড:

দশরথের আদেশে, রামকে যুবরাজ পদে অভিষিক্ত করার আয়োজন শুরু হল। কুব্জা দাসী মন্থরা কৈকেয়ীর মন বিষিয়ে দিল। দশরথের কাছে প্রাপ্য দুই বর চেয়ে নিলেন কৈকেয়ী। এক বরে, ভরতকে রাজা করতে হবে। দ্বিতীয় বরে, রামকে চোদ্দো বছরের জন্য বনবাসে যেতে হবে।

ভরত আর শত্রুঘ্ন ছিলেন মামার বাড়িতে। ফিরে এসে সব শুনে রেগেই আগুন। চিত্রকুটে গিয়ে ভরত কেঁদে জড়িয়ে ধরলেন রামের দু’পা রাম কিছুতেই ফিরতে রাজি হলেন না রামের পাদুকা মাথায় নিয়ে এসে, অযোধ্যার সিংহাসনে বসিয়ে রামের প্রতিনিধি হয়ে, রাজকার্য দেখা শোনা করতে লাগলেন ভরত।

গ. অরণ্যকাণ্ড:

দণ্ডকারণ্যে এলেন রাম-লক্ষ্মণ-সীতা। রাক্ষস বিরাধকে বধ করলেন রাম অগস্ত্য মুনির পরামর্শে, চললেন পঞ্চবটী। পথে দশরথের বন্ধু জটায়ুর সঙ্গে পরিচয় হল। লঙ্কার রাক্ষস-রাজা রাবণের বিধবা বোন শূর্পণখা সুন্দরী নারীর রূপ ধরে এসে প্রথমে রামকে, তারপর লক্ষ্মণকে বিয়ে করতে চাইলেন। শূর্পণখার নাক আর কান কেটে দিলেন লক্ষ্মণ।

প্রতিশোধ নিতে, শূর্পণখা ছুটলেন দাদা রাবণের কাছে। রাবণের আদেশে, খর, দূষণ আর ত্রিশিরা নামের তিন রাক্ষস মহাবীর ছুটে এলেন পঞ্চবটীতে। তিনজনকেই যমালয়ে পাঠালেন রাম। রাক্ষস অকম্পনের পরামর্শে, সীতাকে অপহরণ করার চক্রান্ত করলেন রাবণ। মারীচকে মায়ামৃগের রূপ ধারণ করে পঞ্চবটীতে ঘুরে বেড়াতে আদেশ করলেন। রাবণের ফাঁদে কাজ হল। ‘সোনার হরিণ চাই’-বায়না ধরলেন সীতা।

রাম চললেন হরিণকে ধরতে। মারীচ রামের গলা নকল করে আর্ত চিৎকার করলেন। রামের বিপদের আশঙ্কায় সীতা লক্ষ্মণকে পাঠালেন রামকে ফেরাতে। সেই সুযোগে সন্ন্যাসীর ভেক ধরে রাবণ এসে হরণ করলেন সীতাকে লঙ্কায় নিয়ে চললেন। পুষ্পক রথে।

পথে জটায়ুর সঙ্গে রাবণের ঘোরতর লড়াই হল। রাবণ জটায়ুর ডানা কেটে দিলেন। রাম লক্ষ্মণ সীতার খোঁজে বেরিয়ে মুমূর্যু জটায়ুর কাছ থেকে সব শুনলেন।

শুরু হল পাগলের মতো সীতাকে খোজা। পথে কবন্ধকে বধ করলেন রাম। কবন্ধ দিলেন। সুগ্রীবের খবর।

পম্পা সরোবরের তীরে মতঙ্গ মুনির আশ্রমে রামের প্রতীক্ষায় দিন গুনছিলেন বৃদ্ধা তাপসী শবরী। তাঁকে দেখা দিলেন রাম। তারপর চললেন সুগ্রীবের খোজে।

ঘ. কিস্কিন্ধ্যাকাণ্ড:

বানররাজ সুগ্রীবের সঙ্গে বন্ধুত্ব হল রামের। সুগ্রীব কথা দিলেন, সীতাকে খুঁজে বার করবেন। রাম কথা দিলেন, সুগ্রীবের দাদা বালীকে বধ করে, তাঁর কাছ থেকে রাজ্য আর সুগ্রীবের স্ত্রী রুমাকে আবার ফিরিয়ে দেবেন সুগ্রীবের কাছে। কথা রাখলেন রাম সুগ্রীব কিন্তু নিজের প্রতিজ্ঞার কথা ভুলেই গিয়েছিলেন। লক্ষ্মণের ভয়ে শুরু করলেন জোরদার সীতাঅন্বেষণ। জটায়ুর দাদা সম্পাতির কাছ থেকে সীতার সুলুক-সন্ধান পেলেন বালীর ছেলে অঙ্গদ। ঠিক হল, হনুমান যাবেন লঙ্কায়।

ঙ. সুন্দরকাণ্ড:

মহেন্দ্র পর্বতের মাথা থেকে এক মহালাফ দিলেন মহাবীর হনুমান। এক লাফেই সাগরপার। এলেন লঙ্কায়। অনেক খোঁজাখুঁজির পর, সীতাকে দেখতে পেলেন অশোক বনে।

সীতাকে প্রণাম করে, রাম নাম লেখা রামের আংটি সীতার হাতে তুলে দিলেন হনুমান। সীতাও আঁচল থেকে একটা গয়না বার করে হনুমানের হাতে দিলেন, রামকে দেওয়ার জন্য।

সীতাকে উদ্ধারের নিশ্চিত আশ্বাস দিয়ে হনুমান ফিরে এলেন। সীতার খবর পেয়ে অনেকটা আশ্বস্ত হলেন রাম-লক্ষ্মণ। বানররা আনন্দে হই-চই লাগিয়ে দিল।

চ. লঙ্কাকাণ্ড (যুদ্ধকাণ্ড):

যুদ্ধযাত্রার তোড়জোড় শুরু করলেন রাম। এ দিকে, রাবণের ধর্মভীরু ভাই বিভীষণ সীতাকে রামের কাছে ফিরিয়ে দিতে অনেক অনুরোধ করলেন দাদাকে। ব্যর্থ, অপমানিত হয়ে, বিভীষণ যোগ দিলেন রামের পক্ষে। বানরদের ইঞ্জিনিয়ার নল বানর আর ভলুকদের সাহায্যে বড় বড় পাথরের চাঁই আর বড় বড় গাছ দিয়ে, সাগরের ওপর দিয়ে লঙ্কা পর্যন্ত সেতু তৈরি করে ফেললেন।

রাবণের দুই গুপ্তচর, শুক আর সারণ, রাবণকে গিয়ে সব খবর দিলেন। সুগ্রীব দূর থেকে রাবণকে দেখতে পেয়েই, চড়-কিল-ঘুষিতে রাবণকে ব্যতিব্যস্ত করে আবার রামের কাছে ফিরে এলেন। অঙ্গদও একবার গিয়ে শাসিয়ে দিয়ে এলেন রাবণকে।

সাঙ্ঘাতিক যুদ্ধ করলেন রাবণের বীরপুত্র ইন্দ্রজিৎ। মেঘের আড়াল থেকে নাগপাশে অচেতন করে ফেললেন রাম-লক্ষ্মণকে। খবর পেয়ে সাপের যম গুরুড় ছুটে এলেন সেখানে। ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে পালাল সব সাপ। চেতনা ফিরে পেলেন রাম-লক্ষ্মণ।

রাম-লক্ষ্মণ আর বানরদের সঙ্গে যুদ্ধে একে একে প্রাণ হারালেন ধূম্রাক্ষ, অকম্পন, প্রহস্ত ইত্যাদি রাক্ষস-পক্ষের রথী-মহারথীরা।

এবার রাবণ নিজেই চললেন যুদ্ধে। সঙ্গে চললেন, ইন্দ্ৰজিৎ, অতিকায়, মহোদর, কুম্ভ, নিকুম্ভ ইত্যাদি বীররা।

হনুমানের ঘুষিতে সংজ্ঞা হারালেন রাবণ। রাবণের শক্তিশেলে সংজ্ঞা লোপ হল লক্ষ্মণের । সেদিনের যুদ্ধে নাস্তানাবুদ হয়ে ফিরে গেলেন রাবণ। রাবণের ভাই কুম্ভকর্ণকে অসময়ে ঘুম থেকে টেনে তোলা হল। অসীম বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করে রামের হাতে প্রাণ দিলেন কুম্ভকর্ণ ।

পরদিন। এলেন ইন্দ্রজিৎ। তাঁর তীরে অচৈতন্য হলেন রাম-লক্ষ্মণ। জাম্ববানের আদেশে, হনুমান ঔষধিপর্বত থেকে মৃতসঞ্জীবনী, বিশল্যকরণী, সাবর্ণকরণী আর সন্ধানী এই চার ঔষধের গাছ আনতে গেলেন। ঔষধের গাছ চিনতে না পারায় হনুমান গোটা পর্বতটাই মাথা করে নিয়ে এলেন। ঔষধের গন্ধে রাম-লক্ষণসহ সব বানর সেনা সংজ্ঞা ফিরে পেলেন।

বিভীষণের পরামর্শে, নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারে লক্ষ্মণ বধ করলেন অসহায় ইন্দ্রজিৎকে। এবার রাবণ নিজেই এলেন যুদ্ধে তাঁর শক্তিশেলে লক্ষ্মণের বুক বিদীর্ণ হল। সবাই ভাবলেন, লক্ষ্মণ মারা গেছেন। কান্নায় ভেঙে পড়লেন রাম। বানরদের ডাক্তার সুষেণের পরামর্শে, হনুমান আবার সেই ঔষধির গন্ধমাদন পর্বতশৃঙ্গ তুলে নিয়ে এলেন। বেঁচে উঠলেন লক্ষ্মণ।

রাম-রাবণে ভয়ানক যুদ্ধ শুরু হল। ইন্দ্র স্বর্গ থেকে রথ পাঠিয়ে দিলেন রামকে। রাম যত বার রাবণের মাথা কাটেন, তত বারই সেখানে আবার মাথা গজায়। তখন রাম ব্রহ্মাস্ত্র নিক্ষেপ করলেন। রাবণ প্রাণ হারালেন।

বিভীষণকে লঙ্কার রাজা করা হল। সীতা রাবণের কাছে এতদিন ছিলেন বলে, রাম লোকনিন্দার ভয়ে তাঁকে ফিরিয়ে নিতে চাইলেন না। আগুনে আত্মাহুতি দিতে চাইলেন সীতা। কিন্তু, আগুন জ্বালতেই, স্বয়ং অগ্নিদেব সীতাকে কোলে করে রামের কাছে ফিরিয়ে দিলেন। বললেন, ‘সীতা অপাপবিদ্ধা! শুদ্ধা! পবিত্রতাস্বরূপিণী!’

সীতাকে নিয়ে অযোধ্যায় ফিরলেন রাম আর লক্ষ্মণ। রাম রাজা হলেন। ভরত হলেন যুবরাজ। অযোধ্যায় আনন্দের বন্যা বয়ে গেল।

ছ. উত্তরকাণ্ড:

সীতাকে নিয়ে কিছু দুষ্ট প্রজার কানাঘুষোর কথা রামের কানে এল। রাম লক্ষ্মণকে আদেশ দিলেন, সীতাকে তমসা নদীর তীরে বাল্মীকি মুনির আশ্রমে রেখে আসতে। বাল্মীকি আশ্রমে সীতার দুই যমজ ছেলে হল কুশ আর লব।

অশ্বমেধ যজ্ঞের আয়োজন করলেন রাম।

কৃত্তিবাসী রামায়ণ মতে, যজ্ঞের ঘোড়াটাকে আটকে রেখে একে একে হনুমানসহ, শত্রুঘ্ন, ভরত, লক্ষ্মণ, রাম সকলকে পরাস্ত করলেন বালক কুশ আর লব। বাল্মীকি মুনির মধ্যস্থতায় সবাইকে মুক্তি দেওয়া হল। এ কাহিনী বাল্মীকি রামায়ণে নেই।

যজ্ঞক্ষেত্রে ঋষিবালকের বেশে লব-কুশ শোনালেন বাল্মীকি রচিত রামায়ণ। বাল্মীকি রামকে জানালেন লব-কুশ এবং সীতার কথা। সীতাকে আবার শুদ্ধতার পরীক্ষা দিতে বলা হল। দুঃখে, ক্ষোভে, মা বসুন্ধরার কোলে, পাতালে ফিরে গেলেন সীতা। কালপুরুষের কৌশলে, রামকে দুর্বাসার আগমন বার্তা দিতে গিয়ে, পূর্বশর্ত মতো লক্ষ্মণকে প্রাণ বিসর্জন দিতে হল সরযূ নদীতে।

অনুতপ্ত, শোক-বিহ্বল রাম কুশকে কোশল, আর লবকে উত্তর দেশের রাজা করে দিয়ে, নিজেও প্রাণ বিসর্জন দিলেন সরযূর জলে। ভরত আর শত্রুঘ্নও রামের পথই অনুসরণ করলেন।

৫. রামায়ণের চরিত্র পরিচয়:

রামায়ণ পাঠ ও তা বোঝার জন্য এর বিভিন্ন চরিত্র সম্বন্ধে একটি ধারণা থাকা দরকার। এ উদ্দেশ্যে নিচে সমধিক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রগুলোর সংক্ষিপ্ত একটি পরিচয় তুলে ধরা হল:

১. ইক্ষাকু: রামের পূর্বপুরুষ। অযোধ্যায় রাজা। ইক্ষাকু বংশের প্রতিষ্ঠাতা। বৈব-স্বত মনুর ছেলে। মনুর ‘কুৎ’ অথবা ‘হাঁচি’ থেকে এর জন্ম বলে তাঁর নাম ইক্ষাকু ।

২. উর্মিলা: লক্ষ্মণের স্ত্রী। জনকের নিজের মেয়ে।

৩. কুম্ভকর্ণ: রাবণের মেজ ভাই।

৪. কৈকেয়ী: ভরতের মা। দশরথের অন্যতমা প্রধানা স্ত্রী। অন্যমতে দ্বিতীয়া অথবা তৃতীয়া স্ত্রী। কেকয়রাজ অশ্বপতির মেয়ে তাই তাঁর নাম কৈকেয়ী।

৫. জনক: মিথিলার রাজা। প্রকৃত নাম ‘সীরধ্বজ’। ‘জনক’ একটি উপাধি। সীতার পালক পিতা।

৬. দশরথ রামের পিতা। অজ ও ইন্দুমতীর পুত্র। রঘু বংশের আদি পুরুষ রঘুর নাতি। এঁর তিন স্ত্রী কৌশল্যা, কৈকেয়ী ও সুমিত্রা। এ ছাড়া আরও ৩৫০ স্ত্রী ছিল দশরথের।

৭. নারদ: বিখ্যাত দেবর্ষি ব্রহ্মার মানসপুত্র। ভাগবত মতে এক দাসীর গর্ভে জন্ম হয় নারদের। রামায়ণ রচনার মূলে নারদ। নারদই প্রথম বাল্মীকিকে রামের কথা শোনান।

৮. বালী: বানররাজ। সুগ্রীবের দাদা।

৯. বাল্মীকি: আদি কবি। রামায়ণের রচয়িতা। প্রথম জীবনে দস্যু ছিলেন। নাম ছিল রত্নাকর। তার জন্ম সম্বন্ধে নানা কাহিনী প্রচলিত। দস্যুবৃত্তি দ্বারা উপার্জিত অর্থে সংসার চালাতেন। কিন্তু এ পাপের বোঝা বাবা, মা, স্ত্রী-পুত্র-কন্যা কেউ বহন করতে রাজি না হওয়ায় তিনি দুস্যুবৃত্তি ত্যাগ করেন।

১০. বিভীষণ: রাবণের ছোট ভাই। রামভক্ত।

১১. বিশ্বামিত্র : একজন ব্রহ্মর্ষি। ছিলেন ক্ষত্রিয়, কঠোর তপস্যার দ্বারা তিনি ব্রাহ্মণত্ব লাভ করেন।

১২. ভরত: ভগবান বিষ্ণুর অংশ-অবতার। তিনি বিষ্ণুর চারভাগের একভাগ পান। দশরথ ও কৈকেয়ের পুত্র। রামের ১দিনের ছোট। লক্ষ্মণ ও শত্রুঘ্নের একদিনের বড়। জনকের ভাই কুশধ্বজের মেয়ে মাগুবীর সাথে তার বিয়ে হয় ।

১৩. মেঘনাদ: রাবণ ও তাঁর প্রধানা মহিষী মন্দোদরীর বীর পুত্র।

১৪. রাম: রামায়ণের নায়ক। বিষ্ণুর অবতার। দশরথের পুত্র। মাতা কৌশল্যা। মিথিলার রাজা জনকের পালিতা কন্যা সীতার স্বামী। লব ও কুশ নামীয় যমজ সন্তানের পিতা।

১৫. রাবণ: লঙ্কার রাজা। বিশ্রবা এবং নিকষার পুত্র। এক মতে ব্রহ্মার নাতির পুত্র। দশ মাথা ছিল বলে তার অন্য নাম দশানন। লঙ্কেশ বা লঙ্কেশ্বরও বলা হয়। তিনি রোজ শিবপূজা করতেন।

১৬. লক্ষ্মণ: দশরথ ও সুমিত্রার দুই যমজ ছেলে লক্ষ্মণ ও শত্রুঘ্নের একজন। বিষ্ণুর অংশ-অবতার অর্থাৎ বিষ্ণুর চারভাগের একভাগ শক্তির অধিকারী ছিলেন।

১৭. লব-কুশ: রাম ও সীতার দুই যমজ সন্তান। এদের জন্ম মহর্ষি বাল্মীকির আশ্রমে।

১৮. শত্রুঘ্ন: দশরথ ও সুমিত্রার পুত্র। বিষ্ণুর অংশ অবতার।

১৯. সীতা: জনকের পালিতা কন্যা। রামের স্ত্রী লব-কুশের মা। রামায়ণের নায়িকা। জনকের মেয়ে বলে জানকী। মিথিলার মেয়ে তাই মৈথিলী’। বিদেহের মেয়ে বলে বৈদেহী। সীতা মানে লাঙলের দাগ ক্ষেতে লাঙলের ফলায় টানা ‘সীতা’য় এঁকে কুড়িয়ে পেয়েছিলেন বলে জনক এঁর নাম রাখেন সীতা।

২০. সুগ্রীব: বানররাজা। বালীর ছোট ভাই।

২১. সুমিত্রা দশরথের দ্বিতীয়া/তৃতীয়া) স্ত্রী। মগধরাজের মেয়ে লক্ষ্মণ ও শত্রুঘ্নের মাতা।

৬. রামের রাজত্বকাল:

রাম সর্বমোট বেঁচে ছিলেন ৬৯ বছর ১মাস ১০দিন। তিনি বিয়ে করেছেন ১৩ বছর বয়সে। বনে গেছেন ২৫ বছর বয়সে। ১৪ বছর বনবাসের পর ফিরে এসে রাজা হয়েছেন ৩৯ বছর বয়সে। রাজত্ব করেছেন ৩০ বছর ১মাস ২০ দিন। বলা হয় তিনি নর-লীলা সাঙ্গ করে বিষ্ণু দেহ ধারণ করেন।

৭. রাম বিষ্ণুর অবতার ছিলেন না :

সুকুমারী ভট্টাচার্যসহ প্রায় সকল গবেষকের মতে আদিকাণ্ডের প্রথমার্ধ ও উত্তরকাণ্ড বাদে রামায়ণের বাকি অংশটাই আদি রামায়ণ। আদি রামায়ণে রাম পরিচিত ‘নরচন্দ্রমা’ হিসেবে। রামকে পরবর্তীকালের সংযোজকরা ‘ব্রাহ্মণ্যধর্মের’ (চার বর্ণ ও চার আশ্রম ভিত্তিক ব্রাহ্মণের স্বার্থরক্ষাকারী ধর্ম) প্রতিভূ হিসেবে বিষ্ণুর অবতার হিসেবে চিত্রায়িত করেন। রামকে বিষ্ণুর অবতার বানিয়ে তাঁকে এবং তাঁর স্ত্রী সীতাকে আদর্শস্থানীয় করে একটা ধর্ম প্রতিষ্ঠার চেষ্টাই রচনাকারেরা করেছেন।

৮. রামায়ণ গৃহধর্মের গ্রন্থ:

রামায়ণের বিষয়বস্তু পর্যালোচনা করলে বোঝা যাবে এতে পারিবারিক কতগুলো মূল্যবোধ গঠনের চেষ্টা করেছেন রচনাকারেরা। কয়েকটি উদাহরণ তুলে দেয়া হল: এর

ক. পিতা হচ্ছেন দেবতুল্য। তার সকল আদেশ ও ইচ্ছা অলঙ্ঘণীয়।

খ. জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা হবেন পিতার বিকল্প সুতরাং বড় ভাইয়ের অনুগত থাকা আবশ্যক।

গ. বন্ধুর দাবি রক্ষা করা কর্তব্য।

ঘ. অনুগতদের আশ্রয় দেয়া একটি দায়িত্ব ।

ঙ. দাম্পত্য জীবনে স্বামীই প্রভু। স্ত্রীর ইচ্ছা গৌণ। স্ত্রীর দায়িত্ব স্বামীর সেবা ও তাঁর ইচ্ছা পূরণ করা।

উল্লেখ্য উপরোক্ত মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার জন্য রামায়ণে নানা কাহিনী, উপাখ্যান সংযোজন করা হয়েছে। অলৌকিক অনেক ঘটনা, রূপকথা ইত্যাদিও রামায়ণে সন্নিবেশিত করা হয়েছে। অলৌকিক ঘটনাগুলোর মধ্যে আছে : গন্ধমাদন, বিশল্য করণীর সাহায্যে যুদ্ধে প্রায় পরাস্ত রাম লক্ষ্মণের সংজ্ঞা ফিরিয়ে আনা, যুদ্ধে মায়াসীতা দেখানো, রামের মুণ্ড দেখানো ও নানা মুনিঋষির ও দেবতাদের হস্তক্ষেপ ইত্যাদি।

৯. বাঙালির রামায়ণ ভিন্ন:

বাঙালির কাছে প্রিয় রামায়ণ হচ্ছে কৃত্তিবাস অথবা তুলসীদাসের রামায়ণ এঁরা বাল্মীকির মূল রামায়ণ থেকে সরে এসে মনের মতো করে রামায়ণ লিখেছেন।

১০. রামায়ণের কিছু তথ্য:

রামায়ণ পাঠে তৎকালীন সমাজের একটা চিত্র পাওয়া যায়। বিষ্ণুপদ চক্রবর্তীর আলোচ্য গ্রন্থ থেকে নিম্নলিখিত তথ্য পাওয়া যায়:
ক. রাম-লক্ষণ-সীতা প্রমুখ রাজ পরিবারের সকলেই মাংস খেতেন, মদও পাণ করতেন। রাজা হওয়ার পর প্রমোদ কাননে সীতাকে কোলে বসিয়ে রাম নিজের হাতে করে পবিত্র ‘মেরয়’ মদ পাণ করিয়েছেন। বালির স্ত্রী ‘তারা’ মদ পাণ করতেন।
খ. এক পুরুষের যেমন একাধিক স্ত্রী ছিল, তেমনি এক নারীরও একাধিক স্বামী ছিল।
গ. লক্ষণ কখনও সীতার মুখ দেখেন নি, দেখেছেন পা।
ঘ. রাবণের সৈন্যসংখ্যা ছিল ১০,০০০ কোটি।
ঙ. রাম-রাবণের যুদ্ধ চলে ১৭-১৮ দিন।
চ. সীতার বিয়ে হয় মাত্র ৬ বছর বয়সে।
ছ. রামের সময়ে ছোলা এবং যুগডাল খাওয়া ও দান করা রেওয়াজ ছিল।

১১. তপস্যা করার অপরাধে রামের শুদ্র হত্যা:

রামায়ণ রচয়িতার কাছে ব্রাহ্মণ সন্তানের মূল্য শূদ্রের চেয়ে অনেক বেশি। রামায়ণ বর্ণিত এক ঘটনায় দেখা যায় এক ব্রাহ্মণের ছেলে মারা যায়। সে রামের কাছে এসে অভিযোগ করে যে রাজ্যে পাপকার্য চলছে বিধায় তার ছেলে অকালে প্রাণ হারায়। খুঁজেপেতে দেখা গেল এক শূদ্র-তপস্বী সশরীরে স্বর্গে যাওয়ার জন্য তপস্যা করছে। রাজ্যে এটিই পাপকাজ। রাম তৎক্ষণাৎ শম্বুকের মাথা কেটে ফেলেন। অগস্ত্য মুনি খুশি হয়ে রামকে অনেক দিব্য অলঙ্কার দেন। দেখা যায় শুদ্র হত্যার এই ঘটনাকে রামায়ণ রচয়িতা সমাজের দোহাই দিয়ে গৌরবান্বিত করেছেন।

১২. সীতার পাতাল গমণ ও রামের বিচার:

সীতা অপাপবিদ্ধা, নিষ্কলুষ, নিরপরাধী। রাম যুদ্ধ করে তাঁকে অযোধ্যায় ফেরত আনলেন সত্যি, কিন্তু তাঁকে গ্রহণ করতে চাইলেন না। সীতা অগ্নিতে ঝাঁপ দিলেন। অগ্নিদেব তাঁকে রক্ষা করলেন। রাম তাকে বনবাসে পাঠালেন। সেখানে জন্ম হল লব ও কুশের। সীতাকে আবার সতীত্বের পরীক্ষা দিতে বলা হল। সীতা দুঃখে ক্ষোভে মা বসুধাকে ডেকে পাতালে প্রবেশ করেন। দেখা যাচ্ছে দেবতারা, এমনকি মহাদেব পর্যন্ত সীতার সতীত্ব সম্বন্ধে প্রশংসা করছেন। রাম তবু সীতাকে গ্রহণ করনে নি ।

১৩. রামায়ণ ও মহাভারতের মধ্যে কাহিনীগত মূল পার্থক্য:

রামায়ণের যুদ্ধ হয় রাম ও রাবণের মধ্যে। যুদ্ধের কারণ সীতাহরণ। রাবণ সীতাকে হরণ করেন। রাম যুদ্ধ করে সীতাকে উদ্ধার করেন। এই কাহিনী সকলের বোধগম্য। বিপরীতে মহাভারতের যুদ্ধ এক জটিল সমস্যাকে কেন্দ্র করে। এই যুদ্ধ একই বংশের লোকের মধ্যে যারা ভাই ভাই। বিরোধটি সিংহাসন বা সম্পত্তি লাভের জন্য। দুইভাই ধৃতরাষ্ট্র ও পাণ্ডু। বড় ভাই ধৃতরাষ্ট্র অন্ধ, তাই জ্যেষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও তিনি সিংহাসনে বসতে পারেন নি। বসেন পাণ্ডু। পাণ্ডুর মৃত্যুতে পাণ্ডু-পুত্র যুধিষ্ঠির সিংহাসনের অধিকারী। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে তিনি পাণ্ডুর ঔরসজাত সন্তান নন। এদিকে পাণ্ডুর বড় ভাই ধৃতরাষ্ট্র অন্ধ হওয়ায় আগেই সিংহাসন থেকে বঞ্চিত। তার পুত্র অর্থাৎ দুর্যোধনাদিরা তাই বঞ্চনার প্রতিকার চান। বিশেষত যেহেতু যুধিষ্ঠির পাণ্ডুর ঔরসজাত নন। অতএব দেখা যাচ্ছে রামায়ণের কাহিনী যত সহজ, মহাভারতের কাহিনী ঠিক ততটুকুই জটিল।

১৪. মূল রামায়ণ একটি ক্ষত্রিয় কাহিনী:

মূল রামায়ণ একটি ক্ষত্রিয় কাহিনী ছিল। শত শত বছর ধরে ব্রাহ্মণরা তাদের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠার জন্য এতে নানা কল্প কাহিনী সংযোজন করে/ঢুকিয়ে দেয়। এর জন্য তারা নানা অলৌকিক কাহিনী ও উপাখ্যান তৈরি করে। এসবের মাধ্যমে শূদ্রদের হেয় করা হয়, নারীকে অবমূল্যায়িত করা হয়। পাশাপাশি করা হয় ব্রাহ্মণদের মহিমা কীর্তন। সৃষ্টি করা হয় নানা সম্প্রদায় যথা: শৈব, বৈষ্ণব ইত্যাদি। প্রচার করা হয় এটিই হিন্দুর ধর্মগ্রন্থ রচনা করা হয় আরও কুড়িটি ধর্মশাস্ত্র, আঠারোটি পুরাণ ও অসংখ্য উপপুরাণ। এভাবেই পৌরাণিক আমলে তৈরি করা হয় চারবর্ণ ও চার আশ্রম ভিত্তিক একটি ধর্ম যা আজকের দিনে সনাতন ধর্ম/হিন্দুধর্ম নামে পরিচিত। এর কেন্দ্রে স্থাপন করা হয় পরিবর্তিত রামায়ণ ও পরিবর্তিত মহাভারত। ক্ষত্রিয় কাহিনীকে পরিণত করা হয় ধর্মে।

রামায়ণ সম্পর্কে আরও জানতে :

আরও পড়ুন:

Leave a Comment