বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬১তম জন্মবার্ষিকী আগামীকাল

‘আজি হতে শতর্বষ পরে / কে তুমি পড়িছ বসি আমার কবিতাখানি/ শত  কৌতুহল ভরে / অথবা, আজি হতে শতর্বষ পরে / এখন করিছো গান সে কোন্ নুতন কবি / তোমাদের ঘরে!’এক’শ বছরেরও বেশী আগে বাঙ্গালী পাঠকদের প্রতি এই জিঞ্জাসা ছিল  বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের।

সেই চিরজাগরুক, বাঙালীর আত্মিক মুক্তি ও সার্বিক স্বনির্ভরতার প্রতীক, বাংলাভাষা ও সাহিত্যের উৎকর্ষের নায়ক, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬১তম জন্মবার্ষিকী আগামীকাল।

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬১তম জন্মবার্ষিকী : ১২৬৮ বঙ্গাব্দের এই দিনে জোড়াসাঁেকার ঠাকুর পরিবারে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ঘর আলো করে জন্মগ্রহণ করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ।

তিনি ১৯১৩ সালে তাঁর গীতাঞ্জলী কাব্যগ্রন্থের জন্য সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন। কবির গান-কবিতা, বাণী এই অঞ্চলের মানুষের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তির ক্ষেত্রে প্রভূত সাহস যোগায়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে শুধু নয়, চিরকালই কবির রচনাসমূহ প্রাণের সঞ্চার করে।

আমাদের প্রতিটি সংগ্রামেই শুধু নয়, কবির চিরায়ত রচনাসমগ্র আজীবন স্বরণের র্র্শীষতায় আবিষ্ট হয়ে আছে। তাঁর লেখা ‘আমার সোনার বাংলা/ আমি তোমায় ভালোবাসি’ বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত। মুক্তিযুদ্ধের সময়ও প্রেরণা যুগিয়েছিল তাঁর অনেক গান।

নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে আগামীকাল নোবেল বিজয়ী এই বাঙ্গালি কবিকে স্মরণ করবে তার অগণিত ভক্তরা। শুধু দুই বাংলার বাঙালীই নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বাংলা ভাষাভাষী কবির জন্মবার্ষিকীর দিবসটি পালন করবে হৃদয় উৎসারিত আবেগ ও শ্রদ্ধায়। এবার  জন্মবার্ষিকী উদ্যাপনের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে-‘মানবতার সংকট ও রবীন্দ্রনাথ।’

রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ উপলক্ষে পৃথক বাণী দিয়েছেন।

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের  জন্মবার্ষিকী  উপলক্ষে সরকারের পক্ষ থেকে জাতীয় পর্যায়ে বিস্তারিত কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে।

এ বছর জন্মবার্ষিকীর মূল অনুষ্ঠান হবে রবীন্দ্র স্মৃতিবিজড়িত কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার শিলাইদহের রবীন্দ্র কুঠিবাড়িতে। আগামীকাল বেলা আড়াইটায় উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী এমপি।

সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ এমপি‘র  সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি সিমিন হোসেন রিমি এমপি।

স্বাগত বক্তব্য দেবেন সংস্কৃতি সচিব মো. আবুল মনসুর। স্মারক বক্তা থাকবেন প্রফেসর সনৎ কুমার সাহা। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করবেন কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইদুল ইসলাম।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির পরিবেশনায় নৃত্যনাট্যসহ আধা ঘন্টার সাংস্কৃতিক পর্ব থাকবে। কবিগুরুর জন্মবার্ষিকী উদ্যাপন উপলক্ষে শিল্পকলা একাডেমি তিন দিনব্যাপী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও কবির চিত্রশিল্প প্রদর্শনী এবং কবির উপর নির্মিত ডকুমেন্টারি মাসব্যাপী প্রচারের ব্যবস্থা করেছে।

এছাড়াও ঢাকাসহ কবিগুরুর স্মৃতিবিজড়িত কুষ্টিয়ার শিলাইদহ, সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর, নওগাঁর পতিসর এবং খুলনার দক্ষিণডিহি ও পিঠাভোগে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় ও স্থানীয় প্রশাসনের ব্যবস্থাপনায় যথাযোগ্য মর্যাদায় কবিগুরুর জন্মবার্ষিকী উদ্যাপন করা হবে। এ উপলক্ষ্যে রবীন্দ্রমেলা, রবীন্দ্রবিষয়ক আলোচনা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করেছে স্থানীয় প্রশাসন।

এছাড়াও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ও বাংলা একাডেমি কবিগুরুর জন্মবার্ষিকী উপলক্ষ্যে স্মরণিকা ও পোস্টার মুদ্রণ করবে। বাংলা একাডেমিসহ সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন সকল দপ্তর ও সংস্থাসমূহ এ উপলক্ষ্যে বিশেষ আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করেছে। কবি নজরুল ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালকের তত্ত্বাবধানে ঢাকার রবীন্দ্র সরোবরে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।

নানা সংকট-আনন্দ-বেদনায়, আশা-নিরাশার সন্ধিক্ষণে রবীন্দ্র সৃষ্টি আমাদের চেতনায় বরাবর স্পর্শ  করছে এবং করবে অন্তত আরো এক’শ বছর পরেও- বাঙ্গালি মাত্রই তা বোধ হয় বলতে পারবেন। কবির আশংকার জবাবে বলা যায় শত বছর পরে এখন অনেক নতুন কবি এসেছেন, নব নব সৃষ্টিতে প্রতিনিয়ত স্ফীত হচ্ছে আমাদের সাহিত্য এবং সংগীতের ভূবন।

তারপরেও আমাদের রবীন্দ্রনাথ মাত্র একজন। এখনকার নবীনদের সৃষ্টির উৎসও তিনি। এখনো জীবনের সবকিছুতে হাত বাড়াতে হয় রবীন্দ্রনাথে। তাই কবির বসন্ত গান শতবছর পরেও ধ্বনিত হয় নবীন কবি আর পাঠকের বসন্ত দিনে।

জন্মের দেড় শতাধিক বছর পেরিয়ে এবং মৃত্যুর অনেক বছর পরেও রবীন্দ্রনাথ এখনও কেন প্রাসঙ্গিক-এ ব্যাপারে রবীন্দ্র বিশেষজ্ঞ এবং প্রয়াত বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ এমিরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান একটি প্রবন্ধে লিখেছিলেন, বাঙালীর এই কবি এমন এক সময় জন্মগ্রহণ করেছিলেন, যখন রাষ্ট্র ছিল পরাধীন, চিন্তা ছিল প্রথাগত ও অনগ্রসর, বাংলাভাষা ছিল অপরিণত।

তিনি বলেন, রবীন্দ্রনাথ একাধারে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে বিশ্বমানে উন্নীত করার পাশাপাশি জাতির চিন্তা জগতে আধুনিকতার উন্মেষ ঘটিয়েছেন। বাঙালীর মানস গঠনে পালন করেছেন অগ্রদূতের ভূমিকা।

সত্য, সুন্দর, ন্যায় ও কল্যাণের পথে অভিসারী হয়ে ওঠার প্রেরণা যোগানোর মধ্যদিয়ে বাঙালী মননকে বিশ্বমানে উন্নীত করে জাতিকে আবদ্ধ করে গেছেন চিরকৃতজ্ঞতায়। দেড়শত বছর পেরিয়েও কবি আমাদের মাঝে তাই চিরজাগরূক হয়ে আছেন।

আরও দেখুনঃ

বরিশাল নগরীকে মডেল নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে কাজ করছে বিসিসি

অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়তে শহীদজননীর কর্মজীবন আমাদের পাথেয় : মোস্তাফা জব্বার

নাটোরে গণহত্যা স্মরণে শহীদ সাগর দিবস পালিত

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সৃষ্টিকর্ম

অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়তে শহীদজননীর কর্মজীবন আমাদের পাথেয় : মোস্তাফা জব্বার

ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তি মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার শহীদজননী জাহানারা ইমামের জন্মবার্ষিকীতে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেছেন, স্বাধীনতাবিরোধীমুক্ত অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়তে শহীদজননী জাহানারা ইমামের কর্মজীবন আমাদের কাছে পাথেয়। তিনি যে পথ দেখিয়ে গেছেন সেই পথে আমরা চলছি।

একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়ক অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়তে শহীদজননী জাহানারা ইমামের ৯৩তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আজ আয়োজিত ‘সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মৌলবাদীদের সাম্প্রদায়িক জিহাদ প্রতিরোধ’ শীর্ষক এক আন্তর্জাতিক ওয়েবিনারে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি এসব কথা বলেন।

নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবিরের সভাপতিত্বে ওয়েবিনারে ধারণাপত্র পাঠ করেন নির্মূল কমিটির বহুভাষিক সাময়িকী ’জাগরণ’-এর যুগ্ম সম্পাদক অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট লেখক মারুফ রসুল।

আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নির্মূল কমিটির কেন্দ্রীয় নেতা ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ, টুয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরি ফোরাম ফর হিউম্যানিটি তুরস্ক সাধারণ সম্পাদক লেখক ও চলচ্চিত্রনির্মাতা শাকিল রেজা ইফতি,  সর্ব ইউরোপীয় নির্মূল কমিটির সভাপতি সমাজকর্মী তরুণ কান্তি চৌধুরী, সুইডেনে অবস্থানকারী নির্মূল কমিটির কেন্দ্রীয় নেতা ও জাগরণ-এর যুগ্ম সম্পাদক সাব্বির খান,

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক ব্লগার সুইজারল্যান্ড প্রবাসী অমি রহমান পিয়াল, ‘জাগরণ’-এর হিন্দি বিভাগের সম্পাদক ভারতের সমাজকর্মী তাপস দাস, অনলাইন একটিভিস্ট আইনজীবী সালমান আখতার, নির্মূল কমিটি আইটি সেল সভাপতি শহীদসন্তান আসিফ মুনীর তন্ময়, ব্লগার এন্ড অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট নেটওয়ার্ক-এর সভাপতি ড. কানিজ আকলিমা সুলতানা, কলামিস্ট ও অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট সমাজকর্মী লীনা পারভীন,

নির্মূল কমিটির আইন সহায়ক কমিটির সদস্য এডভোকেট নাসির মিঞা, নির্মূল কমিটি কুমিল্লা জেলা শাখার সভাপতি সাংবাদিক দিলিপ মজুমদার, সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের শিকার মুন্সিগঞ্জের শিক্ষক হৃদয় মন্ডল, সুনামগঞ্জের ঝুমন দাস, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার রসরাজ দাস, কুমিল্লার অনীক ভৌমিক, সিলেট জেলা কৃষক লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক রাকেশ রায়,

সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের শিকার কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স এন্ড ব্যাংকিং বিভাগের ছাত্র জয়দেব চন্দ্র শীল ও নির্মূল কমিটির সাধারণ সম্পাদক সমাজকর্মী কাজী মুকুল।

ভিকটিমদের কাছ থেকে সরাসরি হয়রানির চিত্র জানতে পেরে এই আয়োজনের জন্য একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধা মোস্তাফা জব্বার বলেন, ‘ইসলামিক রিপাবলিক পাকিস্তানকে পরাস্ত করে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আমরা পিপলস রিপাবলিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছি।

বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় এসব মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক ঘটনা হুমকিস্বরূপ। বাংলাদেশ বাঙালি জাতীয়তাবাদের উপর প্রতিষ্ঠিত। মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক অপশক্তি যেভাবে শেকড় গেঁড়েছে বাংলাদেশে তা উপড়ে ফেলা একটা বিরাট চ্যালেঞ্জ।’

তিনি বলেন, সামাজিক যোগযোগ মাধ্যমে যে স্বাধীনতাবিরোধীদের মৌলবাদী কর্মকান্ড চালাচ্ছে তার বিরুদ্ধে সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।

মন্ত্রী বলেন, ‘বিটিআরসি’র মাধ্যমে আমরা বিভিন্ন অনলাইন পোর্টালের আপত্তিকর পোস্ট ও কমেন্ট মুছে ফেলার জন্য একটি অ্যাপস তৈরির পরিকল্পনা করছি। এর বাইরে যেহেতু দেশের ৪ লাখ অ্যাকাউন্ট ফেসবুকের সঙ্গে ব্যবসায়ে যুক্ত তাই ফেসবুক বন্ধ করার কথা বলা যাচ্ছে না।

তবে ফেসবুক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা চলছে নিয়মিত। এখন ফেসবুকের বিভিন্ন পোস্ট রিপোর্ট করে তা মুছে ফেলার ক্ষেত্রে আগে আমাদের সফলতার হার ছিল ৫ ভাগ, এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪০ ভাগে।

মৌলবাদী সন্ত্রাস নির্মূলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা অগ্রণী। আমরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলে তার মাধ্যমে মৌলবাদী সন্ত্রাস নির্মূলে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের এ বিষয়ে সচেতন করার উদ্যোগ নিতে পারি।’

সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের শিকার ভিকটমদের তাদের মামলার বিবরণ আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর জন্য তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী নির্মূল কমিটির প্রতি আহবান জানান।

উল্লেখ্য, এ বছর ৩ মে ঈদুল ফিতরের দিন ছিল নির্মূল কমিটির প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়ক শহীদজননী জাহানারা ইমামের ৯৩তম জন্মবার্ষিকী।

আরও দেখুনঃ

 

নাটোরে গণহত্যা স্মরণে শহীদ সাগর দিবস পালিত

নাটোর জেলার নর্থ বেঙ্গল চিনিকলের গণহত্যা দিবস আজ ৫ মে। ১৯৭১ সালের এই দিনে মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাক হানাদার বাহিনী চিনিকল অবরুদ্ধ করে তৎকালীন প্রশাসকসহ ৪২ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে ব্রাশ ফায়ার করে হত্যা করে।
শহীদদের স্মরণে দিবসটি শহীদ সাগর দিবস হিসেবে পালিত হয়েছে আজ।

মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তান হানাদার বাহিনী উত্তর বঙ্গের হেডকোয়ার্টার হিসেবে নাটোরে অবস্থান নেয়। ৫ মে সকালে তারা লালপুরের গোপালপুরে যাত্রা করে।

নাটোরে গণহত্যা স্মরণে শহীদ সাগর দিবসঃ চিনিকলের কাছাকাছি পৌঁছে গোপালপুর রেল স্টেশনের রেল ক্রসিং এ বাঁধার সম্মুখীন হয়। স্টেশনের পরিত্যক্ত ওয়াগন টেনে এনে  রেল ক্রসিং এ ব্যারিকেড দেওয়া হয়। এই ব্যারিকেডের সাথে জড়িতদের হত্যার মাধ্যমে শুরু হয় হত্যাযজ্ঞ।

হানাদার বাহিনী নর্থ বেঙ্গল চিনিকল ঘিরে ফেলে। চিনিকলের সবগুলো গেটে তালা লাগিয়ে অবরুদ্ধ করে অবাঙ্গালিদের যোগসাজশে বাঙ্গালিদের সনাক্ত করে চিনিকলের এক নম্বর গেট সংলগ্ন পুকুর ঘাটে নিয়ে যায়। তাদেরকে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে নির্মমভাবে ব্রাশ ফায়ার করে হত্যার পর লাশগুলো পুকুরে ফেলে দেয়।

সেই দিনের হত্যাযজ্ঞে কোন অবাঙ্গালি যাতে মারা না পড়ে সে জন্যে তাদের সবার মাথায় সাদা রুমাল বাঁধা ছিল।

পাক হানাদার বাহিনীর লোমহর্ষক হত্যাযজ্ঞের নীরব স্বাক্ষী বুলেটবিদ্ধ হয়ে লাশের স্তুপের নিচে চাপা পড়েও সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে ছিলেন কয়েকজন। তাদের একজন এই চিনিকলের পাওয়ার হাউজের এসবিএ পদে চাকুরী করতেন খন্দকার জালাল আহমেদ।

কিছুদিন আগে না ফেরার দেশে চলে যাওয়া খন্দকার জালাল আহমেদের সাক্ষাৎকার থেকে জানা যায় ওইদিনের ঘটনার বিবরণ। তিনি বলেন, আনুমানিক সকাল সাড়ে দশটা। ডিউটি করছি। দুজন পাক সেনা আমার দুপাশে এসে দাঁড়ালো।

একজন পিঠে রাইফেল ঠেকিয়ে বললো, ‘ইয়ে বাঙ্গালি চলো, মিটিং হোগা, মিটিং মে চলো’। এসময় মাথায় সাদা রুমাল বাঁধা মঞ্জুর ইমান নামে একজন অবাঙ্গালি কর্মচারী বাঙ্গালিদের সনাক্ত করে দিচ্ছিল।

এদিকে মিলের প্রশাসক আনোয়ারুল আজিমসহ অন্যান্যদের ধরে এনে মাটিতে বসিয়ে রাখে। একজন পাক অফিসার আজিম সাহেবকে লক্ষ্য করে বলে, ‘কিসনে মেজর আসলামকে মারা হায়’? তিনি বলেন, ‘জানিনা’।
নরপশুরা আমাদেরকে অফিসার্স কোয়ার্টারের পুকুর ঘাটে নিয়ে গিয়ে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করায়। তখনই বুঝতে পারলাম, নিশ্চিত মারা যাচ্ছি। কয়েক মিনিটের মধ্যে ঘাতকদের ১৩টি স্বয়ংক্রিয় এলএমজি এক সঙ্গে আমাদের ওপর গর্জে উঠে।

গগনবিদারী চিৎকারে আকাশ-বাতাসে আর্তনাদ ছড়িয়ে পড়ে। মুহুর্তের মধ্যে পুকুর ঘাট লাশের স্তুপে পরিণত হয়। তাজা রক্তের স্রোতে রক্ত রাঙা হয়ে যায় পুকুরের পানি। নিথর নিস্তব্ধ হয়ে যায় প্রকৃতি। মৃত্যু নিশ্চিত করতে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে পুকুরের মধ্যে গড়িয়ে দেয় মরদেহগুলো।

এক সময় জ্ঞান ফিরে দেখি, আমার মাথাটা পুকুর ঘাটের সিড়ির ওপরে এবং শরীরের অর্ধেকটা রক্তে রঞ্জিত পানির মধ্যে ডুবে আছে। লাশের স্তুপের মধ্যে উল্টিয়ে-পাল্টিয়ে জীবন্ত কাউকে খুঁজে ফিরছে আমার এক সহকর্মী মেহমান আলী।

বুঝলাম, তিনিই আমাকে লাশের স্তুপের মধ্যে থেকে উদ্ধার করেছেন। বহু কষ্টে উঠে বসতেই দেখতে পেলাম, পাশে পড়ে আছে ছোট ভাই মান্নানের লাশ। সে বিভৎস দৃশ্যের কথা মনে হলে আজও শিউরে উঠি, গায়ে কাঁটা দিয়ে লোম খাড়া হয়ে উঠে।

শহীদদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে শহীদ সাগর চত্বরে স্মৃতিসৌধ ও জাদুঘর নির্মিত হয়েছে। ১৯৭৩ সালের ৫ মে মিলের প্রশাসক লে: আনোয়ারুল আজিমের স্ত্রী বেগম শামসুন্নাহার শহীদ সাগর চত্ত্বরে স্মৃতিসৌধ উদ্বোধন করেন।

স্মৃতি ফলকে ৪২ জন শহীদের নামের তালিকা লিপিবদ্ধ করা আছে। আনোয়ারুল আজিমের নামানুসারে গোপালপুর রেল স্টেশনের নামকরণ করা হয় আজিমনগর স্টেশন।

মুক্তিযুদ্ধে আত্মদানের স্বীকৃতি হিসেবে শহীদ আনোয়ারুল আজিমকে ২০১৮ সালে সরকার স্বাধীনতা পদক (মরনোত্তর) প্রদান করে। প্রতিবছর শহীদদের আতœীয়-স্বজন, চিনিকলের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও স্থানীয় লোকজন ৫ মে শহীদ সাগর চত্বরে সমবেত হন।

তমালতলা কৃষি ও কারিগরি কলেজের উপাধ্যক্ষ বাবুল আকতার বলেন, ৩০ মার্চ লালপুরের ময়নায় পাক হানাদার বাহিনীর সাথে প্রতিরোধ যুদ্ধে ৪০জন বাঙালী এবং পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মেজর খাদেম হোসেন রাজাসহ সাতজন নিহত হন।

মেজর রাজাসহ সাতজন হত্যার প্রতিশোধ এবং নর্থ বেঙ্গল চিনিকলের প্রশাসক লে. আনোয়ারুল আজিম বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতার কারনেই সম্ভবত শহীদ সাগর হত্যাযজ্ঞ।

নাটোরের নর্থ বেঙ্গল চিনিকল হাইস্কুলের দশম শ্রেণীর ছাত্র রিদওয়ান হোসেন জানায়, নতুন প্রজন্ম কৃতজ্ঞ চিত্তে স্মরণ করে শহীদ সাগরের এই আত্মদানকে। চিনিকলের ওই সময়ের সহকারী হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা শহীদ মোছাদ্দারুল হক দেশের জন্যে প্রাণ দিয়েছেন বলে গর্ববোধের কথা জানালো তাঁর নাতনী একই স্কুলের দশম শ্রেণীর ছাত্রী ফাইজা ফারহা।

শহীদ সাগর প্রাঙ্গনে প্রবেশ করলে ফুলের গাছগুলো মনকে পবিত্র করে দেয়। শত বছরের প্রাচীন আর আকাশ ছোঁয়ার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকা ১৩টি পাম গাছ  যেন বিষন্নতা ছড়িয়ে দিচ্ছে, কেঁদে ওঠে মন।

পুকুরের চারিদিকে গাছের তলায় শহীদদের মরদেহগুলো গণকবর দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু দু:খের বিষয়, এসব কবর চিহ্নিত করা নেই। কবরগুলো চিহ্নিতকরণের পদক্ষেপ নেয়া হবে বলে প্রত্যাশা স্থানীয়দের ।

প্রতিবছর শহীদদের আতœার স্মরণে শ্রদ্ধা নিবেদনের সুযোগ করে দেয় নাটোরের নর্থ বেঙ্গল চিনিকল কর্তৃপক্ষ। শহীদদের স্মরণে নির্মিত স্মৃতি সৌধ প্রাঙ্গণে আয়োজন করা হয় আলোচনা সভা, পবিত্র  কোরআন তেলাওয়াত ও দোয়া মাহফিল।

এবারও নাটোরের  চিনিকল কর্তৃপক্ষ একই কর্মসূচির আয়োজন করে। চিনিকলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনিসুল আজমের  সভাপতিত্বে এ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন স্থানীয় সংসদ সদস্য  মো: শহিদুল ইসলাম বকুল।

আরও দেখুনঃ

কারিগররা ঈদ-উল-ফিতর উপলক্ষে হাতের কাজ ও সেলাইয়ে ব্যস্ত

যেকোন মূল্যে উন্নত নাগরিক সেবা নিশ্চিত করতে হবে : চসিক মেয়র

ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে চাপ বৃদ্ধি পেলেও স্বাভাবিক গতিতে চলছে দূরপাল্লার পরিবহন

নাটোর জেলা

গণহত্যা

শহীদ সাগর স্মৃতিস্তম্ভ

সাবেক অর্থমন্ত্রী বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল মাল আবদুল মুহিত আর নেই

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ, রাজনীতিবিদ, ভাষাসৈনিক, সাবেক অর্থমন্ত্রী ও সিলেট-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল মাল আবদুল মুহিত আর নেই। শুক্রবার দিবাগত রাত ১২টা ৫৬ মিনিটে রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে তিনি ইন্তেকাল করেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।

 

আবুল মাল আবদুল মুহিত আর নেই তার বয়স হয়েছিল ৮৮ বছর। বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় সাবেক অর্থমন্ত্রী বেশ কিছুদিন ধরে অসুস্থ ছিলেন। মাঝে তাকে কয়েক দফায় হাসপাতালে ভর্তিও করা হয়।

 

তিনি ২০০৯ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকারের অর্থমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। অর্থমন্ত্রী হিসেবে আ’বুল মাল আবদুল মুহিত ১২টি বাজেট উপস্থাপন করেছেন। আ’বুল মাল আবদুল মুহিত ১৯৩৪ সালের ২৫ জানুয়ারি সিলেটে জন্মগ্রহণ করেন। তৎকালীন সিলেট জেলা মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠাতা আবু আহমদ আবদুল হাফিজ ও সৈয়দা শাহার বানু চৌধুরীর ১৪ সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয় সন্তান। পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন তার ছোট ভাই। স্ত্রী সৈয়দা সাবিয়া মুহিত একজন ডিজাইনার। তিন সন্তানের মধ্যে কন্যা সামিনা মুহিত ব্যাংকার ও আর্থিক খাতের বিশেষজ্ঞ। বড় ছেলে সাহেদ মুহিত বাস্তুকলাবিদ এবং ছোট ছেলে সামির মুহিত একজন শিক্ষক।

যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে উচ্চতর ডিগ্রি নেয়া আবদুল মুহিত বরাবরই একজন মেধাবী মানুষ ছিলেন। ১৯৫৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক (সম্মান) পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করেন। পরের বছর একই বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৫২ সালে অংশ নেন ভাষা আন্দোলনে। ছাত্রজীবনে তিনি সলিমুল্লাহ হল ছাত্র সংসদের ভিপি নির্বাচিত হয়েছিলেন।

১৯৫৬ সালে আবদুল মুহিত যোগ দেন পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসে (সিএসপি)। সিএসপিতে যোগ দিয়ে তিনি ওয়াশিংটন দূতাবাসে পাকিস্তানের কূটনীতিকের দায়িত্ব নেন এবং মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ১৯৭১ সালের জুনে পাকিস্তানের পক্ষ ত্যাগ করেন। ওই সময় তিনি বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করেন এবং যুক্তরাষ্ট্রে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

আ’বুল মাল আব্দুল মুহিত তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান, কেন্দ্রীয় পাকিস্তান ও পরে বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। স্বাধীনতার পর দেশে ফিরে তিনি পরিকল্পনা সচিব হন। এর আগে পাকিস্তান পরিকল্পনা কমিশনের উপসচিব থাকাকালে তিনি পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে  বৈষম্যের ওপর ১৯৬৬ সালে একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছিলেন। পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে এটিই ছিল এ বিষয়ে প্রথম প্রতিবেদন।

১৯৭২-৭৩ সালে বাংলাদেশ বিশ্বব্যাংকের সদস্য হলে সেপ্টেম্বরে মুহিত হন বিশ্বব্যাংকে বাংলাদেশের পক্ষে ভারত, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা গ্রুপের বিকল্প নির্বাহী পরিচালক।
১৯৭৭-৮১ পর্যন্ত তিনি অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব ছিলেন এবং ১৯৮১ সালে স্বেচ্ছায় সরকারি চাকরি ছেড়ে দেন। তিনি বিশ্বব্যাংক ও জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করেন।
তিনি বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। স্বাধীনতাযুদ্ধে অনন্য ভূমিকা রাখার স্বীকৃতি হিসেবে সরকার তাকে ২০১৬ সালে স্বাধীনতা পদকে ভূষিত করে। মুক্তিযুদ্ধ, জনপ্রশাসন, অর্থনীতি ও রাজনৈতিক বিষয়ে তিনি ৪০টি বই লিখেছেন।

আ’বুল মাল আবদুল মুহিতের পারিবারিক সূত্র জানিয়েছে আজ সকাল সাড়ে ১০টায় রাজধানীর গুলশান আজাদ মসজিদে আ’বুল মাল আবদুল মুহিতের প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। এরপর বেলা সাড়ে ১১টায় জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। বেলা ১২টায় তার মরদেহ সর্বস্তরের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে নেয়া হবে। সেখান থেকে দাফনের জন্য মরদেহ নেয়া হবে তার জন্মস্থান সিলেটে। সেখানে রায় নগরের পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হবে।

আরও দেখুনঃ

অনলাইনে ক্ষুদ্র ব্যবসা করে স্বাবলম্বী হয়ে উঠছেন অনেকেই

কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজ থেকে পড়াশোনা শেষ করেছেন দিদারুল আলম। চাকরি খোঁজার পাশাপাশি টিউশনি করেই চলছিল তার জীবনের চাকা। কিন্তু করোনাভাইরাসের কারণে হঠাৎ থমকে দাঁড়াতে হয়েছিল তাকে। টিউশনি বন্ধ, কী করবেন ভেবে পাচ্ছিলেন না। বিকল্প কিছু একটা করার পথ খুঁজছিলেন।অনলাইনে ক্ষুদ্র ব্যবসা করে স্বাবলম্বী হয়ে উঠছেন ।

ঠিক এমন সময় তাকে পথ দেখালেন কাজী আপন তিবরানী নামের একজন শিক্ষক। তার দেখানো স্বপ্নে শুরু হলো দিদারুল আলমের জীবনের নতুন গল্প। আট মাস নিজের মাত্র দুই হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে অন-লাইনে শুরু করেন সামুদ্রিক মাছের ক্ষুদ্র ব্যবসা।

অনলাইনে ক্ষুদ্র ব্যবসা করে স্বাবলম্বী: দিদারুল আলমের দুই হাজারের সেই পুঁজি এখন আড়াই লাখ ছাড়িয়েছে। দিদারুল আলম এখন স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে বহুদূর যাওয়ার। বললেন-ম্যাডাম আমাকে নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর পথ দেখিয়েছেন। তাই চাকরির জন্য না ঘুরে চেষ্টা করছি উদ্যোক্তা হওয়ার।

রোকসানা আক্তার সুমি। কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলা সদরে বসবাস করেন। বাসার কাজ ও লেখাপড়ার করেই দিন পার করতেন সুমি। করোনাভাইরাসের কারণে হঠাৎ থমকে দাঁড়াতে হয়েছিল তার পরিবারকেও ।

এ সময়ে রোকসানা আক্তার সুমিকে কাজী আপন তিবরানী পরামর্শ দেন উদোক্তা হওয়ায়। তার কথামতে কুমিল্লার ঐতিহ্য খাদি নিয়ে কাজ শুরু করেন সুমি। খাদি কাপড় কিনে নিজের হাতে বাহারি ব্লক ও নকশী কাজে তৈরি করেন থ্রী-পিস, শাড়ি, পাঞ্জাবি এবং ফতুয়া পণ্য। অনলাইনলে চলে কেনা বেচা।


এ রকম শুধু দিদারুল আলম কিংবা সুমিই নন, স্বপ্নবাজ নারী কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের ইংরেজি বিভাগের প্রভাষক কাজী আপন তিবরানীর উদ্যোগে পাল্টে গেছে হাজারো জীবনের গল্প।

এ শিক্ষকের আহ্বানে সাড়া দিয়ে অন-লাইনে ক্ষুদ্র ব্যবসায় সম্পৃক্ত হয়েছেন ২০ হাজারের বেশি তরুণ-তরুণী, গৃহবধূ থেকে শুরু করে বিভিন্ন শ্রেণীর নারী-পুরুষ। তিনি ভিক্টোরিয়া ই-কমার্স নামক ফেসবুক পেজের মাধ্যমে এ আহ্বান জানান।

যাদের মধ্যে অন্তত ১৫শ জন ইতোমধ্যে অন-লাইনে ক্ষুদ্র ব্যবসা করে স্বাব-লম্বী হয়ে উঠছেন। অনেকে হয়ে উঠছেন উদ্যোক্তাও।

শুধু ফেসবুক পেজই নয়, ই-কমার্সে উদ্যোক্তাদের প্রতিষ্ঠিত করতে বিনামূল্যে অন্তত ২০টি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছেন আপন তিবরানী। এর সবই করেছেন নিজ খরচে। ইতোমধ্যে তার এসব কার্যক্রম কুমিল্লায় বেশ সাড়া ফেলেছে। ই-কমার্স ঘিরে সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে আরও অনেকের কাজেরও।

শুরুর কথা বলতে গিয়ে কাজী আপন তিবরানী বাসসকে জানান, শিক্ষক বলতে আমি বুঝি শিক্ষার্থীদের পথ দেখানো। আমি ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক হলেও কলেজের অধিকাংশ শিক্ষার্থীর সঙ্গে আমার বেশ ভালো সম্পর্ক।

তারা বন্ধুর মতো আমার কাছে সব কথাই শেয়ার করে। করোনার শুরুতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণার পরপরই তাদের টিউশনি বন্ধ হয়ে যায়। সে সময় অনেক শিক্ষার্থী বলতো- ম্যাডাম একটা টিউশনির ব্যবস্থা করে দেন না। আর তো চলতে পারছি না।

কারণ টিউশনি করেই চলে এমন শিক্ষার্থীর সংখ্যাও অনেক। আর করোনার কারণে কলেজ বন্ধ থাকায় বাসায় অলস বসে থাকতেও বিরক্ত লাগছিল।

এ ছাড়া অনেক আগে থেকেই চিন্তা ছিল নারীদের জন্য কিছু করার। তিবরানী জানান, ওই সময়টায় মনে হলো এসব শিক্ষার্থী চাচ্ছে কেউ একজন তাদের পথ দেখাক। ভাবছিলাম, তাদের জন্য কী করা যায়।

এরপর গত বছরের ১১ আগস্ট ভিক্টোরিয়া কলেজের সঙ্গে মিল রেখে এবং শিক্ষার্থীদের কথা ভেবে চালু করলাম ভিক্টোরিয়া ই-কমার্স নামে ফেসবুক পেজ। তাদের ছোটখাটো ব্যবসা করার পরামর্শ দিতে থাকলাম।

অবাক করা ব্যাপার হলো, প্রথম দিনেই পেজের সদস্য এক হাজার ছাড়িয়ে যায়। আর মাত্র তিন দিনে ১০ হাজার। বর্তমানে এ  অলাইন ব্যবসার প¬্যাটফর্মে যুক্ত রয়েছে প্রায় ১ লাখ ১৫ হাজার সদস্য।

প্রথমে আমাদের কলেজের শিক্ষার্থীদের জন্য উদ্যোগটা নিলেও বর্তমানে এখানে আছেন তরুণ-তরুণী, বিভিন্ন কলেজের শিক্ষার্থী ও গৃহিণীসহ বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষ।

তিবরানী আরও জানান, একসময় দেখলাম ই-কমার্সে তাদের দক্ষ করে তুলতে হলে প্রশিক্ষণ দেওয়া দরকার। এরপর স্কিল ডেভেলপমেন্টের ওপর অন-লাইনে বেশ কয়েকটি প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থা করি। প্রতিটি প্রশিক্ষণে ৫ হাজারের বেশি সদস্য অংশগ্রহণ করে।

এ ছাড়া সরাসরি প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে আরও প্রায় দশটি। ব্লক-বাটিকের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও করি। এতে বেশ সাড়া পড়ে। আবার যারা কৃষি কাজ করতে আগ্রহী তাদের কৃষিবিষয়ক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করি।

সেটাও সরাসরি কৃষি জমিতে গিয়ে। বর্তমানে ২০ হাজারের বেশি সদস্য কিছু না কিছু করছেন। যাদের প্রায় ১৫শ জন অনলাইনে ক্ষুদ্র ব্যবসা করে স্বাব-লম্বী হয়েছেন। কুমিল্লার সঙ্গে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের তরুণরাও এ ক্ষুদ্র ব্যবসায় যুক্ত আছেন।

তিনি বলেন, আমার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা হচ্ছে এসব তরুণ-তরুণীর মধ্যে উদ্যোক্তা হওয়ার মানসিকতা সৃষ্টি করা। চাকরির জন্য বসে না থেকে নিজে কিছু করা। গৃহিণীরাও যেন ঘরে বসে কিছু করতে পারে সেই লক্ষ্যে কাজ করা। আর তরুণ প্রজন্মকে জাগিয়ে তোলা।

আরও দেখুনঃ

 

বাংলাদেশসহ বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, প্রতিবেদন, বিশ্লেষণ, খেলা, বিনোদন, চাকরি, রাজনীতি ও বাণিজ্যের বাংলা নিউজ পড়তে ভিজিট করুন

Exit mobile version